ভাষা আন্দোলনের দর্পণে অমর একুশে : রক্ত ঋণ থেকে বিশ্বজনীনতা
বিশ্বরূপ দাস, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৩২
"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?"
১৯৫২ থেকে ২০২৬। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ সাতটি দশক আর চারটি বছর। আজ আমরা পালন করছি ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর তথা ২৭ তম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। যা শুরু হয়েছিল ঢাকার রাজপথে একুশের লড়াই দিয়ে, তা আজ বিশ্বজুড়ে ১৯৩টি দেশে পালিত এক পরম সত্য। কিন্তু এই ৭৪ বছরে দাঁড়িয়ে আমাদের অর্জন আর আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো একবার খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলেছিল, তা কেবল একটি ভাষার অধিকারের লড়াই ছিল না; তা ছিল একটি জাতিসত্তার আত্মপরিচয় রক্ষার প্রথম ধাপ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের বুকের রক্ত কেবল রাজপথ ভেজায়নি, বরং বপন করেছিল স্বাধীনতার বীজ। ১৯৯৯ সালে ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিবসের উদযাপন প্রমাণ করে যে— মায়ের ভাষা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন।
এখন প্রশ্ন জাগে ভাষা কি আজ নিরাপদ?
এর উত্তরে বলি ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছরে দাঁড়িয়ে আমরা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সামনে। একদিকে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে আসীন, অন্যদিকে প্রযুক্তির এই যুগে আমরা 'ভাষিক উপনিবেশবাদের' শিকার হচ্ছি।
বিপন্ন ভাষা : ইউনেস্কোর তথ্যমতে, প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এই ৭৪ বছরে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা নিঃশব্দে বিলীন হয়ে গেছে।
সাংস্কৃতিক সংকরায়ন : ডিজিটাল দুনিয়ার দাপটে আমাদের প্রাণের ভাষা আজ মিশ্রণ আর অপপ্রয়োগের কবলে।
অশ্লীলতার দায় :- আমাদের প্রাণের ভাষাকে নিয়ে অনেকেই খিস্তি খেউর করছেন।চটুল, অশ্লীল গান লেখা হচ্ছে। এই ভাষায় নোংরা কথা লিখতে অনেকেরই এখন হাত কাঁপে না।সোশ্যাল মিডিয়ায় তার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। তার ফলে ভাষা তার গরিমা হারাচ্ছে।
তবুও আমাদের সকলের মনে রাখা উচিত একুশ মানে কেবল শোকের কালো ব্যাজ নয়, একুশ মানে রুখে দাঁড়ানোর সাহস। একুশ আমার সেই মা, যার আঁচলে পরম শান্তিতে জুড়িয়ে যায় তপ্ত প্রাণ। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আজ যখন পেছনের দিকে তাকাই, দেখি সেই রক্তপলাশগুলো এখনো ঝরে পড়েনি; সেগুলো আজ বিশ্বমঞ্চের প্রতিটি কোণে রক্তিম বর্ণে জ্বলজ্বল করছে।
সাতটি দশক পেরিয়েও আজো কমেনি তো তার বীর্য।"
ভাষা আন্দোলনের এই ৭৪ বছরে আমাদের শপথ হোক— কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবনে, প্রযুক্তিতে এবং মননে বাংলাকে শুদ্ধভাবে লালন করা। পৃথিবীর প্রতিটি বিলুপ্তপ্রায় ভাষার পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের প্রকৃত একুশ উদযাপন।
বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই সেই সব ভাষা শহীদদের প্রতি, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমি আমার ভাষায় কথা বলছি, স্বপ্ন দেখছি, আর লিখছি এই শব্দমালা।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজকর্মী


