চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

The color suits রং যেন মোর মর্মে লাগে


 

The color suits 

রং যেন মোর মর্মে লাগে


🟣  বিশ্বরূপ দাস 


বসন্ত মানেই রঙের খেলা, রূপের খেলা আর হৃদয় উজাড় করে অপরের হৃদয়কে রঞ্জিত করার খেলা। বসন্ত মানেই মন পবনের নৌকা বেয়ে পলাশের বনে দুজনে লুকোচুরি খেলা।

ঋতুরাজ বসন্তের সমাগমের সাথে সাথেই নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লেগে যায়। পিচকারির রঙে রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি। অশোকে কিংশুকে অলক্ষ্য রঙ অকারণ সুখে হৃদয়ে দোলা দিয়ে যেন বলে যায় "ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল/লাগলো যে দোল/স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল"।প্রাণ মাতানো সেই দোলের দোলায়, রংয়ের সম্মোহনী জাদু স্পর্শে মনের শান্তিনিকেতনের নবীন পাতায় যেমন লাগে নব হিল্লোল তেমনি কোকিলের কুহুতানে হৃদয়ের দখিন দরজা যায় খুলে। সেখান থেকে বইতে থাকে ফাগুন হাওয়া। সেই হাওয়ায় সাম্প্রদায়িক ভেদ বুদ্ধি দূর হয়। পর হয় আপন। বন্ধুত্বের বন্ধন নিবিড় থেকে নিবিড়তর হয়। মানুষের মনে জেগে ওঠে সৌরভের শিখা।

হোলি যেন উৎসবের ত্রিবেনী সঙ্গম। যেখানে প্রেম, বন্ধুত্ব এবং ধর্ম মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এর প্রাচীন ইতিহাসে ধর্মীয় কাহিনী যতই থাক না কেন বর্তমানে এই উৎসব শুধুই প্রেম, ভালোবাসা এবং বন্ধুত্বের উৎসব। একতার উৎসব। আমাদের সামাজিক জীবনের এক মাঙ্গলিক উৎসব।

         দোল বা হোলি কবে শুরু হয়েছিল এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা আছে। আছে নানান লোককাহিনী। শোনা যায় ত্রেতা যুগে ভগবান বিষ্ণু ধুলির পূজো করেছিলেন। সেই ধুলি বা ধুলেন্দি থেকে হোলি উৎসব শুরু হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। আবার অনেকে মনে করেন প্রিয় ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করার জন্য নরসিংহ রূপী ভগবান বিষ্ণু দুষ্টু রাজা হিরণ্যকশিপুকে যেদিন হত্যা করেছিলেন সেই দিনটি "মন্দের ওপর ভালোর জয়" হিসেবে উদযাপন করার জন্য এই হোলি উৎসব শুরু হয়। তার আগের দিনটি অনেক জায়গায় হোলিকা বা ন্যাড়া পোড়া উৎসব হিসাবে পালিত হয়। কারণ ঐদিনে পিতা হিরণ্য কশিপুর নির্দেশে হোলিকা নিজের কোলে বসিয়ে প্রহ্লাদকে মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভগবানের ইচ্ছায় হোলিকা নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রহ্লাদ অক্ষত থাকে। 

বৃন্দাবনে শ্রী রাধিকা গোপীনিদের সাথে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের সাথে  হোলি খেলেছিলেন বলে কথিত আছে। "আজ হোলি খেলবো শ্যাম তোমার সনে/একলা পেয়েছি তোমায় নিধুবনে..."বা " ও শ্যাম যখন তখন খেলো না খেলা এমন/ধরলে আজ তোমায় ছাড়বো না- গানগুলি যেন তারই পরিচয় বহন করে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে বৃন্দাবনের সেই লীলারস  বাঙালির হৃদয়কে এমনভাবে আবির রঙে রঞ্জিত করেছে যে বসন্তের হাওয়া বইতে শুরু করলে সবাই রঙে রঙে রঙিন হয়ে ওঠার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। 

হোলি উৎসব যে প্রাচীন তা জানা যায় বিভিন্ন তাম্রলিপি এবং শিলালিপি থেকে। সম্প্রতি বিন্ধ্য অঞ্চলের রামগড়ে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা গেছে যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৩০০ বছর আগেও হোলি উৎসব পালন করা হয়েছিল। এছাড়াও মধ্যযুগীয় বিভিন্ন চিত্রকর্মে যথা মেওয়ার চিত্রকর্ম, বুন্দি মিনিয়েচার এবং আহম্মেদানগর চিত্রকর্মে এই হোলি খেলার বিভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়াও  নারদ পুরাণ, জৈমিনির পূর্ব মীমাংসা দর্শন সূত্র এবং ভবিষ্য পুরান সহ বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থের হোলির পরিচয় পাওয়া যায়। শুধু পুরাণ কেন মোগল আমলেও রাজা বাদশারা জাঁকজমক ভাবেই এই রং এর উৎসব পালন করতেন।মানুচির "স্টোরিও দ্য মোগর" এবং আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের "আ নিউ একাউন্ট অফ ইস্ট ইন্ডিজ" গ্রন্থের পাতায় পাতায় সেইসব কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে।

হুমায়ুন, আকবর এবং জাহাঙ্গীরের আমলে এই উৎসবকে ঘিরে চলতো সাজো সাজো রব। নাচ গানের আসর বসত। থাকতো খানাপিনার অঢেল ব্যবস্থা। দেশ বিদেশের নানা আমির উমরাহ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট অতিথিরা সেখানে আসতেন। গোলাপজল, আতর, আবির, রং আর শরাবের জোয়ারে মেতে উঠতো দিল্লির দরবার, পথঘাট, মিনাবাজার থেকে শুরু করে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলি। কিন্তু বর্তমানে "সেই রামও নেই অযোধ্যাও নেই"। তবে হোলি আছে নিজস্ব মহিমায়। সেখানকার যুবক যুবতীরা "রংবরসে ভিগি চুনারওয়ালি ..." গানের তালে তালে আজও রঙের উৎসবে মেতে ওঠে নিজস্ব সংস্কৃতিতে। 

সত্যি কথা বলতে কি আমাদের বাংলার যে দোল উৎসব বা বসন্ত উৎসব তার অর্ধেকটা যদি হয় বৃন্দাবনীয় প্রভাব তাহলে অর্ধেকটা অবশ্যই শান্তিনিকেতনের সংস্কৃতির এক  প্রত্যক্ষ প্রভাব। দোল বা হোলি শুধু সামাজিক জীবনে আবদ্ধ নয় তা বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক লেখকদের কলমে সাহিত্যের বিশেষ অঙ্গ হিসেবে আমাদের হৃদয়ে রঞ্জিত করেছে যুগের পর যুগ। শূদ্রকের মৃচ্ছকটিক নাটক, কালিদাসের মালবাগ্নিমিত্রম, হর্ষের রত্নাবলী নাটক, জয়দেবের গীতগোবিন্দম, শ্রীজীব গোস্বামীর শ্রী গোপাল চম্পু, কবি কর্নপুর পরমানন্দ সেনের আনন্দ বৃন্দাবন চম্পু, জ্ঞানদাস, উদ্ভব দাসের একাধিক বৈষ্ণব পদে বসন্ত উৎসব তথা বসন্ত লীলার উজ্জ্বল কাহিনী লিপিবদ্ধ রয়েছে। এছাড়াও আধুনিক যুগে তারাশঙ্করের হাঁসুলী বাঁকের উপকথায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "পদ্মা নদীর মাঝি"তে অদ্বৈত মল্লবর্মনের "তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাসে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কথা কাহিনী'তে, নজরুল ইসলামের বিভিন্ন গানে, জয় গোস্বামীর কবিতায়, বালিকা বধূ, দাদার কীর্তি, বসন্ত বিলাপ এর মতো ছবিতে দোল বা হোলির যে ছবি আমরা দেখতে পাই তা শুধু পাঠকের হৃদয়ে নয়, সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসে মনি মানিক্যের মতো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। 

        সবশেষে বলতেই হয় আধুনিক যুগের দোলের একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর লেখা ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল, ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়, নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগলো, ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে, রং লাগালে বনে বনে, আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে, আজ খেলা ভাঙার খেলা, একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও প্রভৃতি গান বাঙালির চির সম্পদ। এছাড়াও বসন্ত এসে গেছে, তুমি বন্ধু কালাপাখি আমি যেনো কি, বসন্ত বাতাসে সইগো বসন্ত বাতাসে বসন্তকহিল সখি কোকিলা দাখিল রে, এর মতো .এরকম অজস্র গান বর্তমানে নেটে দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

     গানের সুরে, রঙের জোয়ারে আর ফুলের সৌরভে নেট দুনিয়া কাঁপবে, যুবক যুবতীর মল্লিকা বনে ফুটে উঠবে প্রথম প্রেমের কলি। আমরা তাড়িয়ে তাড়িয়ে তা উপভোগ করব।কিন্তু সেই রংয়ের উৎসবে যেন কোনভাবেই রাজনীতির রং না লাগে। সেই উৎসব যেন কোনভাবেই গাঁজা, ভাং,মদের উৎসব না হয়।যেন শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে না যায়। বরং হৃদয়ের অলিন্দ থেকে আমাদের রাঙা রাঙা হাসিগুলো যেন উপচে পড়ে  জগতের কল্যাণে।

কবির কথায়, ".. বসন্ত আজ হাতের উপর হাত/ বসুন্ধরায় মোহন বাঁশির সুর/রুদ্র- পলাশ রবীন্দ্র গান বাজে/ হৃদয় খোঁজে আমার অচিনপুর"।

(তথ্যসূত্র : অন্তর্জাল এবং গীতবিতান)
লেখক : তেজগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এর শিক্ষক
( পূর্ব বর্ধমান)