চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

Purity of language ভাষার আবহমানতা ও শুদ্ধতার লড়াই


 

Purity of language 

ভাষার আবহমানতা ও শুদ্ধতার লড়াই




🟣  বিশ্বরূপ দাস


"মোদের গরব মোদের আশা আ'মরি বাংলা ভাষা"

                                               -- অতুলপ্রসাদ সেন


বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। সেই ভাষার প্রতিটি অনুতে পরমাণুতে মিশে আছে আমাদের সহজাত আবেগ, ভালোবাসা এবং দরদ। আছে ভাটিয়ালী সুর, মাটির টান আর বনময়ূরের কত্থক। আছে উদার বৈরাগী মাঠে একতারার ঝংকার, জোছনার চন্দন। এই ভাষা মহাসাগরের মতো বিশাল এবং মহাপুরুষের মতো উদার। সেই উদারতা নিয়ে সে উদার ছন্দে পরমানন্দে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সকল ভাষাকে সাদরে বরণ করে নিয়ে নিজের জঠরে সযত্নে লালন পালন করেছে। দিয়েছে তার মাতৃস্নেহ। তারপরে সেই সব ভাষা বাংলার জলবায়ু হাওয়ায় পুষ্ট হয়ে বাংলার নিজের ঘরের যেন সন্তান হয়ে উঠেছে। তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে গেছে এই বাংলার মাটিতে। বরং বলা ভালো বাংলার মানুষ তাদের আপন করে নিয়েছে।

তাই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা আমাদের প্রতি প্রত্যেকের আশু কর্তব্য।

কিন্তু সেই কর্তব্য শুধু এক দিনের নয়। বরং দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, একনিষ্ঠ সৈনিকের মত নিরবিচ্ছিন্ন এবং ধারাবাহিকভাবে আমাদের সেই লড়াই করে যেতে হবে। প্রয়োজনে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের মত বীর শহীদদের বুকের রক্ত দিয়ে দিতে হবে পুষ্পাঞ্জলি। 

           একথা অনস্বীকার্য যে ভাষা আবহমান কাল ধরে নদীর গতিপথের মতোই পরিবর্তনশীল। সেই পরিবর্তন শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, সৃষ্টি নন্দনও। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রসিক পাঠককে সৃজনশীলতার সাথে নতুনত্বের আস্বাদ দেয়।

আমরা এখন আর কেউ চর্যাপদ বা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন যুগের ভাষায় কথা বলি না। মঙ্গলকাব্যের কবিদের মতো কিংবা শাক্ত পদাবলীর সাধকদের মতো বর্তমানে কেউ আর কবিতা লেখেন না। উনবিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বে গদ্য সাহিত্যের শৈশবকালে যে ভাষায় সাহিত্য রচনা হতো সেই ভাষা এবং রচনাশৈলীরও বহু পরিবর্তন হয়েছে। বিষয় বৈচিত্রের সাথে বাংলা ভাষার নব নব রূপ পাঠক সমাজকে চমৎকৃত করেছে। যুগের পরিবর্তনে বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি, উর্দু থেকে শুরু করে ঝুড়ি ঝুড়ি ইংরেজি শব্দ ঢুকে গেছে এবং সেগুলোকে আমরা সাদরে গ্রহণ করেছি। এখনও করছি,আগামী দিনেও করবো।

ভাষার এই রূপ পরিবর্তনের মূল কারণ  পাঠান মোগল যুগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ভারতে ইংরাজির মত পাশ্চাত্য সাহিত্যের ব্যাপক প্রভাব, উপনিবেশিকতাবাদ, নাগরিক সভ্যতার উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং প্রযুক্তিবিদ্যা চর্চা।         

          আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা বাংলা ভাষা চর্চায় ইংরেজির ব্যবহার কে বিষ নজরে দেখেন এবং আপত্তি তোলেন। অনেকে মনে করেন ইংরেজি ব্যতিরেকে কথা বললে বা সাহিত্যচর্চা করলে তা অতি উত্তম হবে। তারা মনে করেন পরের ভাষাকে এভাবে প্রশ্রয় দেওয়া অনুচিত কাজ। তাতে বাংলা ভাষার শুদ্ধতা নাকি হারিয়ে যায়। তাদের মতে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কোনো আগন্তুক বা বিদেশি শব্দ ব্যবহার করা মুর্খামির কাজ হবে। ব্যবহারিক জীবনে কথায় বার্তায়, লেখালেখিতে এবং প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দে বাংলার কাদা মাটি রূপ নিছক তৎসম, তদ্ভব ও অর্ধতৎসম শব্দ এবং দেশি শব্দ দিয়েই গড়ে তুলতে হবে বাংলা ভাষা মায়ের তিলোত্তমা মূর্তি। 

                   তাদের এই একগুঁয়েমি বা একপেশে মানসিকতা ভাষার শ্রীবৃদ্ধির অন্তরায় একথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিংবা বলা যেতে পারে ভাষার প্রতি অতি আবেগের ফলশ্রুতি। নতুবা ব্যাকরণ, ভাষার ইতিহাস ও ভাষাজ্ঞানের অভাব। 

একটু ভেবে দেখলেই তাঁরা দেখতে পাবেন বিজ্ঞান বিষয়ক উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলা ভাষাভাষী ছেলেমেয়েদের এখনও ইংরেজির দারস্ত হতেই হয়। বাংলায় উপযুক্ত বই/ পরিভাষা না থাকার কারণে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাদের ইংরেজির স্মরণাপন্ন হতে হয়।ভিনদেশী মানুষের সাথে মতবিনিময় এর ক্ষেত্রে ইংরেজি ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না। ঔষধ পত্রের নাম এখনো বাংলায় বের হয়নি। তাই বাংলার মানুষেরা ইংরেজি ওষুধই খেয়ে থাকেন। সকালে যার শব্দে ঘুম ভাঙে, যার সাহায্যে ঘরে বসে দূরের বন্ধুর খোঁজখবর নেন এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করেন সেই অ্যালার্ম, মোবাইল এবং মোটর গাড়ি / সাইকেল সবই বিদেশি শব্দের দোসর। এই ধরনের বিদেশী শব্দের ব্যবহারের বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। বরং অন্য ভাষা চর্চার (ইংরেজি, আরবি ফারসি প্রভৃতি ) কারণে বাংলা ভাষার ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়। বাংলা কাব্য কাননে ফুটে ওঠে সৌরভমন্ডিত সুবর্ণ কুসুম। যার রূপ - রং - শব্দ - গন্ধস্পর্শে মোহিত হয়ে ভ্রমর রূপ পাঠক, লেখক, সাহিত্যিক এখানে ভিড় জমান। 

       আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত বাংলা  ইংরেজির মতো একটি মিশ্র ভাষা। মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংশের খোলস ত্যাগ করে আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীতে আমাদের এই বাংলা ভাষার জন্ম হয়। জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের বাংলা ভাষা সকলের সাথে মিলেমিশে থাকাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। তার সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সে অপর ভাষা থেকে নির্বিচারে বহুমূল্য রত্ন সম প্রয়োজনীয় শব্দ নিয়ে নিজের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

আর দীর্ঘদিন সেই ভান্ডারে থাকার কারণে সেই শব্দগুলো বাংলার মাটিতে যেন "এক দেহে লীন হয়ে" নবজন্ম লাভ করেছে। তাই সেই সব শব্দকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার করাটা অপরাধ নয় বরং গৌরবের।

            বর্তমানে মৌলিক শব্দের ( তৎসম, তদ্ভব এবং অর্ধ তৎসম) সাথে দেশি, বিদেশি এবং প্রাদেশিক শব্দ বাংলার সাথে এমন করে মিশে গেছে যে ইচ্ছা করলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয় বা তাকে ত্যাগ করা যাবে না। এগুলো আমাদের রান্নাঘরের চাল, ডাল, আলু, কপির মতো ঠিক জীবনের রসদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সেইসব রসদ বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা বা ব্যবহারিক জীবনের কথাবার্তা বলাও এক প্রকার অসম্ভব। জোর করে করতে গেলে সাহিত্য পরম উপাদেয়'র পরিবর্তে রসগন্ধ হীন একপ্রকার বিস্বাদ পদার্থে পরিণত হবে। ভাষা হারাবে তার সহজাত সৌন্দর্য এবং সাবলীলতা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বিদ্যাসাগর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং কাজী নজরুল ইসলামের মত বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক, পন্ডিতেরা বাংলা ভাষায় আগত এই সমস্ত বিদেশী ভাষা বা আগন্তুক ভাষার মর্যাদা কতখানি তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কর্তার ভূত প্রবন্ধে স্বচ্ছন্দে লিখেছিলেন

"ইজ্জত দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে"।

পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছিলেন "আরবি ফার্সি শব্দের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা আহাম্মকী" ছাড়া আর কিছু নয়। একটু লক্ষ্য করে দেখবেন বাংলার নিজস্ব শব্দের সাথে আরবি ফারসি ভাষার সহজ সুন্দর ব্যবহারের কারণে নজরুলের কাব্যসম্ভার মণিমুক্তোর মতো হয়ে উঠেছে। বেনামিতে লেখা বিদ্যাসাগরের রচনা হয়ে উঠেছে সমাজ পরিবর্তনের চাবুক। আবার এই বাংলা ভাষায় রচিত গীতাঞ্জলি কাব্যের (ইংরেজি অনুবাদ) হাত ধরেই আমরা পেয়েছি আমাদের দেশের তথা সাহিত্যের প্রথম নোবেল। পেয়েছি বিশ্ব চলচ্চিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার অস্কার। 

   তাই যারা শুদ্ধ বাংলা নিয়ে মাতামাতি করছেন বা বাংলা ইংরেজি ভাষা দোষে দুষ্ট হয়ে গেল  বলে "গেল গেল" রব তুলছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি আমাদের কথ্য বা চলিত বাংলাকে ব্যাকরণ সম্মতভাবে বলতে, পড়তে এবং লিখতে শিখলেই তার শুদ্ধতা বজায় থাকবে। বাংলা ভাষা নিজেই শুদ্ধ। তাকে আর নতুন করে গঙ্গা জল ছিটিয়ে শুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। শুধু সেই ভাষা নিয়ে খিস্তি খেউর না করলেই হল।  তার শুদ্ধতা এবং শালীনতা বজায় রাখতে হলে উপযুক্ত শব্দচয়ন ও তার যথাযথ ব্যবহার ভীষণভাবে প্রয়োজনীয়। সেটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ব্যক্তির শিক্ষা, তার সামাজিক অবস্থান এবং পরিবেশের উপর।

আমাদের মনে রাখা উচিত বাংলায় বলতে গিয়ে বা লিখতে গিয়ে অনর্গল ইংরেজি বলে যাওয়া/লেখা যেমন কাম্য নয় তেমনি ইংরেজি/হিন্দিতে কথা বলতে/লিখতে গিয়ে অনর্গল অন্য ভাষার সাহায্য নেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। এর জন্য পরিমিতি বোধ এবং মার্জিত রুচিবোধের প্রয়োজন। তার বেশি এদিক-ওদিক হয়ে গেলেই শুদ্ধ অশুদ্ধ হয়ে পড়বে। তার দায়ভার সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিবিশেষের। ভাষার নয়।

যদি কেউ ইচ্ছা পূর্বক করেন বা নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এরকম ধারা করতেই থাকেন বা জোর করে অপরের উপর চাপিয়ে দেন কিংবা তাদের সেগুলো অনুসরণ করতে বাধ্য করেন তাহলে ভাষাপ্রেমী মানুষরা আবার জেগে উঠবে। সেই বকচ্ছপ ভাষার বিরুদ্ধে আবারও শুরু হবে আপোষহীন এক সংগ্রাম - নতুন ২১শে ফেব্রুয়ারী! তাই সাধু সাবধান! 

পরিশেষে বলি

"বাংলা আমার জীবনানন্দ, বাংলা প্রাণের সুখ/আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ"। 

সেই বাংলার মুখ দেখতে গেলে শুধু তৎসম শব্দের একটা আয়নায় হবে না। তার সাথে চাই আরও নতুন নতুন বিদেশী শব্দ। চাই নব্যগঠিত শব্দ, মুন্ডমাল শব্দ, সংক্ষেপিত পদ, জোড়কলম শব্দের মতো হীরকখচিত আয়না যার রূপ লাবণ্যে এই বাংলার মায়াভরা পথে আমরা পাবো তৃষ্ণার জল, বাঁধবো সুখের ঘর। তার হাত ধরেই সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে সগর্বে বলে উঠবো "আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই / আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুজে পাই"।

             লেখক : শিক্ষক, তেজগঞ্জ হাইস্কুল, পূর্ব বর্ধমান।