Scrooling

কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আউসগ্রামের বিউটি বেগম # নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রীসভায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে শপথ নিলেন ডঃ সুকান্ত মজুমদার ও শান্তনু ঠাকুর # অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভুগছেন ? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ অয়ন শিকদার আগামী ২১ জুলাই বর্ধমানে আসছেন। নাম লেখাতে যোগাযোগ 9734548484 অথবা 9434360442 # আঠারো তম লোকসভা ভোটের ফলাফল : মোট আসন ৫৪৩টি। NDA - 292, INDIA - 234, Others : 17 # পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফলাফল : তৃণমূল কংগ্রেস - ২৯, বিজেপি - ১২, কংগ্রেস - ১

Jagadish Chandra Basu আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর অব্যক্ত অবদান


 

 Jagadish Chandra Basu 


আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর অব্যক্ত অবদান



Abhijit Mitra 
Sangbad Prabhati, 30 November 2023

🔵 অভিজিৎ মিত্র

আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর (৩০ নভেম্বর ১৮৫৮ – ২৩ নভেম্বর ১৯৩৭) জীবনী লেখার জন্য আমি এই লেখা লিখতে বসিনি। বাঙালীর এক সহজ ধারনা যে আচার্য জগদীশ চন্দ্র ‘গাছেরও প্রান আছে’ আবিষ্কার করেছিলেন – সেই আবিষ্কার যে আদপে উনি করেন নি, আসলে উনি ক্রেসকোগ্রাফ নামক গাছের সূক্ষ্ম বৃদ্ধি মাপার এক যন্ত্র তৈরি করেছিলেন যা দিয়ে গাছের যন্ত্রনার কাঁপনগুলোও ধরা পরত - সেই সাধারন ভুল ধরিয়ে দেবার জন্যও কলম ধরিনি। আমি এখানে আমার পাঠক পাঠিকাদের কাছে এক সমালোচনা গোছের প্রশ্ন করতে এসেছি। যে সন্মান, খ্যাতি ও প্রচার একদম প্রথম আন্তর্জাতিক বাঙালি বিজ্ঞানী হিসেবে আচার্য জগদীশ চন্দ্রের পাওয়া উচিৎ ছিল, তা উনি পেলেন না কেন? পশ্চিমা দুনিয়া থেকে জীবদ্দশায় বঞ্চনা পাবার পর, আমাদের, দেশবাসীদের, থেকেও কি এই ঔদাসীন্য ওনার কপালে লেখা ছিল? তাহলে কি নীরদ সি চৌধুরীর কথাই ঠিক ধরে নেব – আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতি?

আচার্য বসু একাধারে পদার্থবিদ ও উদ্ভিদ গবেষক (ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি গবেষনা বলতে যে কি বোঝায়, সেটা প্রকৃত অর্থে আচার্য বসুই প্রথম দেখিয়েছিলেন), ইঞ্জিনীয়ারিং যন্ত্র আবিষ্কারক ও লেখক। হাতে-কলমে প্রথম ইলেক্ট্রনিক ডায়োড তৈরি করে দেখিয়েছিলেন। আবার উনি অয়ারলেস কমিউনিকেশন বা বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থার, বিশেষ করে মিলিমিটার ওয়েভ কমিউনিকেশনের, জনক যা থেকে ওয়াকি-টকি, রেডিও, টিভি, মোবাইল, স্যাটেলাইট ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্ত বেতার যন্ত্রের অগ্রগতি এবং যা নিয়ে আজ পৃথিবীর অগুনতি বিজ্ঞানীরা গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন (যার মধ্যে এই অধমও একজন)। এমন এক মেধাসম্পন্ন বাঙালি যিনি জেভিয়ার্স কলেজ থেকে পাস করে ইংল্যান্ডে গিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়তে গেলেন কিন্তু ভাল লাগল না, তাই চলে এলেন। তারপর আবার গেলেন। এবার বিজ্ঞান পড়তে। স্যার র‍্যালে-র কাছে কাজ করলেন (যারা অয়ারলেস কমিউনিকেশন নিয়ে গবেষনা করেন, তারা স্যার র‍্যালে ও র‍্যালে চ্যানেল, কে এবং কি, খুব ভাল করে জানেন), স্যার র‍্যালের সুপারিশে কলকাতায় এসে সরাসরি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভৌতবিজ্ঞানের প্রফেসর হয়ে বসলেন, এবং সেই ব্রিটিশ জমানায়, যখন বাঙালি কর্মিদের অচ্ছুতদের মত দূরে সরিয়ে রাখা হত, একটা ২৪ স্কোয়ার ফুট ঘরের মধ্যে মুখ গুঁজে কাজ শুরু করলেন। কলেজ থেকে গবেষনার অর্থসাহায্য পাওয়া যেত না, তাই নিজের মাইনের টাকাতেই একে একে যন্ত্র তৈরি করতে শুরু করলেন।

পাঠক, এখানে একটা কথা কিন্তু কিছুতেই ভুললে চলবে না। আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেটা ১৮৮৫। তখনো স্যার সি ভি রমন জন্মান নি (উনি আচার্য বসুর থেকে ৩০ বছর ছোট ছিলেন), সেই সময় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস তৈরি হচ্ছে, লাজপত রাই নিজের পার্টি তৈরি করছেন, আস্তে আস্তে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে উঠছে, ইংরেজরা ভারতীয় দেখলেই নেটিভ ইন্ডিয়ান বলে লাথি মারতে উদ্যত হচ্ছে, সেই সময় এক বিজ্ঞানসাধক নিজের ২৪ স্কোয়ার ফুট অফিসের মধ্যে ঘাড় গুঁজে বিজ্ঞানসাধনা করে চলেছেন। একটু এদিক ওদিক হলেই ঠাঁই হবে ব্রিটিশদের তৈরি জেলে। কি, এবার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে?     

নভেম্বর ১৮৯৫। আচার্য বসু কলকাতায় টাউন হলে দেখালেন বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে ৭৫ ফুট দূরে কোন তার ছাড়াই কিভাবে বেল বাজানো যায়, দুম করে গান পাউডার ফাটানো যায়। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখল। সবার মনে হল, এই মানুষ কোন সাধারন মানুষ নন, নিশ্চয় জাদুকর। এই জনসভায় উনি যে রিসিভার ব্যবহার করেছিলেন, তা ছিল মারকারি দিয়ে তৈরি। অনেকটা একই রকম যন্ত্র সহযোগে একই আবিষ্কার মার্কনি ১৮৯৬ সালে ইংল্যান্ডে টেলিগ্রাফের ক্ষেত্রে দেখালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তার পেটেন্ট নিয়ে নিলেন। সেই থেকে অনুপ্রানিত হয়ে ইংল্যান্ডে ১৮৯৭ সালে মার্কনি এক বেতার টেলিগ্রাফ যন্ত্রের কোম্পানি খুললেন, আর ১৯০৯ সালে নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন। কিন্তু আচার্য বসু যেহেতু তার আবিষ্কার পেটেন্ট করতে উৎসাহিত ছিলেন না, ফলে গোটা পৃথিবীর কাছে ওনার কৃতিত্ব অব্যক্ত রয়ে গেল।

এর পাশাপাশি ১৮৯৪-১৯০০ সালের মধ্যে উনি তৈরি করেছিলেন এক মাইক্রোওয়েভ সনাক্তকারী সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্র যা দিয়ে মাইক্রোওয়েভের ১২ থেকে ৬০ গিগাহার্জ (১ গিগাহার্জ = প্রতি সেকেন্ডে ১০০ কোটি কম্পন) অব্ধি সনাক্ত করা যেত। সেই যন্ত্রে ওনার আবিষ্কৃত ক্রিস্টাল সনাক্তকারী ছিল হাতে-কলমে তৈরি প্রথম সেমিকন্ডাক্টর ডায়োড। ১৮৯৭ সালে লন্ডনে এক প্রদর্শনীতে উনি এই আবিষ্কার দেখান। এবার ভাবুন, সেই ডায়োডের ওপর ভর করে তিনজন আমেরিকান বিজ্ঞানী বার্ডিন, ব্র্যাটেন এবং শক্‌লে পরবর্তীকালে ট্রানজিস্টর আবিষ্কার করে ১৯৫৬ সালে নোবেল পেয়ে গেলেন। হায় রে ভাগ্য, আচার্য বসু বেতার ও যোগাযোগ নিয়ে যে যে গবেষনা করলেন, যা যা দেখালেন, সেইসবের কৃতিত্ব নিয়ে চলে গেল অন্যরা। ওনার ভাগ্যে হয়ত মহাভারতের কর্ণ চরিত্রের মত নিস্ফলের হতাশের দলে থাকাই লেখা ছিল। অবশ্য, এই ডায়োডের জন্য, অপছন্দের সঙ্গে, ১৯০৪ সালে প্রথম এশিয়ান বিজ্ঞানী ইসেবে উনি আমেরিকার থেকে এক পেটেন্ট আদায় করেছিলেন।

এরপর আবার উনি লন্ডনের রয়াল সোসাইটি-তে ১৯০১ সালে ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্রের ব্যবহার দেখাতে যান। উনি দেখিয়েছিলেন, গাছের এক অংশে যদি বিষ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেই গাছের বেশিরভাগ অংশ এই বিষের থেকে দূরে সরে থাকতে চায়। প্রমান হিসেবে উনি ব্রোমাইড ব্যবহার করেছিলেন। সেদিন উনি দেখিয়েছিলেন গাছেরাও অনেকটা আমাদের মত, তারা আঘাত পেলে কেঁপে ওঠে। রয়াল সোসাইটির বেশির ভাগ সদস্য সেই প্রদর্শনে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন কারন সেদিন প্ল্যান্ট বায়োলজির এক নতুন দিক সবার সামনে খুলে গেছিল। কিন্তু কিছু সদস্য এর বিরোধীতা করলেন। ভাবুন, বিজ্ঞানের এক বরপুত্র, যিনি নিজের সময়ের থেকে অন্তত ৬০ বছর এগিয়ে ছিলেন, তাকে সারা পৃথিবীর নাক-উঁচু মানুষদের সামনে কতবার অগ্নি-পরীক্ষা দিতে হয়েছে! মামলা লড়তে হয়েছে। কারন একটাই – তিনি যে ব্রিটিশ পদানত নেটিভ ইন্ডিয়ান!

যে আক্ষেপগুলো উনি হয়ত জীবদ্দশায় কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারেন নি, সেগুলোই লেখক হিসেবে কলম ধরার পর উনি লিখেছিলেন। ১৯২১ সালে ওনার বই ‘অব্যক্ত’ প্রকাশিত হবার সময় কথারম্ভে উনি লিখেছিলেন – ‘মানুষ মাতৃক্রোড়ে যে ভাষা শিক্ষা করে সে ভাষাতেই সে আপনার সুখ-দুঃখ জ্ঞাপন করে। প্রায় ৩০ বৎসর পূর্বে আমার বৈজ্ঞানিক ও অন্যান্য কয়েকটি প্রবন্ধ মাতৃভাষাতেই লিখিত হইয়াছিল। তাহার পর বিদ্যুত-তরঙ্গ ও জীবন সম্বন্ধে অনুসন্ধান আরম্ভ করিয়াছিলাম এবং সেই উপলক্ষে বিবিধ মামলা মোকদ্দমায় জড়িত হইয়াছি। এ বিষয়ের আদালত বিদেশে, সেখানে বাদ-প্রতিবাদ কেবল ইয়োরোপীয় ভাষাতেই গৃহীত হইয়া থাকে। এ দেশেও প্রিভি-কাউন্সিলের রায় না পাওয়া পর্যন্ত কোন মোকদ্দমার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় না। জাতীয় জীবনের পক্ষে ইহা অপেক্ষা অপমান আর কি হইতে পারে? ইহার প্রতিকারের জন্য এ দেশে বৈজ্ঞানিক আদালত স্থাপনের চেষ্টা করিয়াছি। ফল হয়তো এ জীবনে দেখিব না’। এই সেই আচার্য বসু যার লেখা ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ দাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন উঠেছিল, ‘পলাতক তুফান’ আজো বাংলা ভাষার প্রথম কল্পবিজ্ঞান রচনা হিসেবে ধরা হয়। লেখা পড়ে ওনার বন্ধু রবিঠাকুর লিখে পাঠিয়েছিলেন – ‘এগুলি পড়িয়া অনেকবারই ভাবিয়াছি যে যদিও বিজ্ঞান বাণীকেই তুমি তোমার সুয়োরানী করিয়াছ, তবু সাহিত্য সরস্বতী সে পদের দাবী করিতে পারিত – কেবল তোমার অনবধানেই সে অনাদৃত হইয়া আছে’।

ভাবলে অবাক লাগে, বিদ্যাসাগর তার জীবনের শেষ কিছু বছর কাটিয়েছিলেন ঝাড়খন্ডের কার্মাটার নামক এক অখ্যাত গ্রামে, কলকাতার ভীড় থেকে দূরে। আচার্য বসুও তার জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটিয়েছিলেন গিরিডি-তে। হয়ত উদ্ভিদ গবেষনা তার এক কারন ছিল। কিন্তু এইসব যুগপুরুষরা সারাজীবন যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে অসন্মানিত হয়ে এক সময় যে লোকচোখের আড়ালে চলে যেতে চাননি, সে কথা কি জোরের সঙ্গে বলা যায়?

প্রশ্ন, যে আচার্য আমাদের বিজ্ঞানসাধনাকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নত করলেন, সামান্য কিছু উপাদান দিয়ে নিজের সর্বস্ব দিয়ে কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার আমাদের সামনে রেখে গেলেন, যার লেখনীর গুনমুগ্ধ ছিলেন স্বয়ং রবিঠাকুর, আজ তার জন্মদিনে সবাই এত চুপচাপ কেন? মাত্র একটা বসু বিজ্ঞান মন্দির (তাও তার নিজের তৈরি), তার নামে চাঁদের ৯১ কিলোমিটার লম্বা এক গহ্বর, ওনার নামে শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেনের পোশাকি নাম আর জন্মের ১৫০ বছর উপলক্ষ্যে আন্তর্জাতিক IEEE প্রকাশনীর তরফ থেকে এক বিশেষ সংখ্যায় (Microwave Magazine) তার প্রতি স্বীকৃতি যে উনিই ছিলেন বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থার জনক – শুধু এটুকুই কি প্রাপ্য ছিল তার? আমাদের আর কোন দায়িত্ব ছিল না? আমাদের আর কোন দায়িত্ব নেই? বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী সমাজে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান যেন বহুলাংশে অব্যক্ত হয়েই রইল।

(লেখক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যক্ষ, আই-আই-টি গুয়াহাটির ভূতপূর্ব অধ্যাপক এবং বিগত আড়াই দশক জুড়ে লেখক বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা/ সঙ্কেত প্রক্রিয়াকরন বিষয়ের ওপর গবেষনা করছেন)