চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

শতবর্ষে বর্ধমান ডিস্ট্রিক্ট রাইস মিলস অ্যাসোসিয়েশন # উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যের সেরা অদিশা দেবশর্মা, দশের মেধা তালিকায় ২৭২ জন # আধার কার্ডের ফটোকপির অপব্যবহার রুখতে বিজ্ঞপ্তি জারি # ইউনেস্কো'র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো # বাংলার চিকিৎসক উজ্জ্বল পোদ্দার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরার তালিকায়সরকারি কর্মচারীদের সুখের দিন শেষ, শ্রম কোড চালু হতে চলেছে সমগ্র ভারতে পশ্চিমবঙ্গে কোভিড বিধিনিষেধ প্রত্যাহার #পূর্ব বর্ধমান জেলায় মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এর উদ্যোগে খালবিল ও চুনোমাছ উৎসবের উদ্বোধন ২৫ ডিসেম্বর

ভুল হয়ে গেছে বিলকুল (নজরুল শ্রদ্ধাঞ্জলি)


 

ভুল হয়ে গেছে বিলকুল 
  (নজরুল শ্রদ্ধাঞ্জলি) 



🟣 বিশ্বরূপ দাস 



 ➡️ ভোটের ফলাফল, করোনা ভাইরাস আর দুরন্ত ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের মাহফিলে আমরা এতোই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে আজ ২৬ মে (১১ জৈষ্ঠ্য) মহা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনের কতটা গুরুত্ব, বেমালুম ভুলে গেছি । তাই প্রথমেই সেই মহান কবির কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে বিনম্র প্রণাম জানাই। তারপর তাঁর উদ্দেশ্যে বলি ---


মানবতা, জ্বলন্ত দেশপ্রেম আর অসাম্প্রদায়িকতার মূর্ত প্রতীক

হে কবি,

আমরা প্রতিনিয়ত বিদ্রোহ করছি কমবেশি তোমার ভাষায়। কিন্তু সবটা নয়। কারণ আমাদের মতো তোমার বিশেষ ব্যক্তিগত কোনো চাহিদা ছিল না।ছিল না স্বার্থ কিম্বা গদির লোভ। শোষণ মুক্তির অবসানই ছিল তোমার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। আর হিন্দু মুসলিমের সম্প্রীতি সাধনা ছিল তোমার জীবন সাধনা। আমরা তো জানি তুমি বিদ্রোহ জানিয়েছিলে সার্বিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে,শোষণ-শাসন- অত্যাচার এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে।তাই উদাত্ত কন্ঠে শোষণমুক্তির আওয়াজ তুলে তোমার কণ্ঠেই ঘোষিত হয়েছিল সেই কালজয়ী গান "কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙে ফেল কররে লোপাট" ....। কোনো বিশেষ ধর্ম নয় বরং মনুষ্যত্ব এবং মানবধর্মের জয়গান গেয়ে তুমি বলেছ "গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই/নহে মহীয়ান"। কখনও অভয় দিয়ে অনাগত সুন্দর দিনের কামনা করে বলেছ "ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?/প্রলয় নূতন সৃজন বেদন!/আসছে নবীন--জীবনহারা অসুন্দরের করতে ছেদন!" দেশের বিপদের দিনে তোমাকেই বলতে শুনেছি "দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ/কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান/আছে কার হিম্মত....."। নারীদের যোগ্য সম্মান দিয়ে সেই কবে তুমি বলেছ "এই পৃথিবীতে যা কিছু মহান চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার সৃজিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর "। আবার কখনও সভ্যতার নয়া কারিগর বিশ্বকর্মা রূপী শ্রমিকদের জয়গান গেয়ে বলেছ "তারই পদ রজ অঞ্জলি করি/মাথায় লইবো তুলি"।কবি এই বিষ(বিংশ) শতাব্দীতে আমরা বি. দ্র. ই , বিদ্রোহী নই! কোথায় সেই সাহস, কোথায় নিঃস্বার্থ জ্বলন্ত দেশপ্রেম ? তোমার মতো আমাদের আগুনে ভাষায় কোথায় ? কোথায় সেই চির উন্নত শির ?কোথায় তোমার সেই বিষের বাঁশি? আর একবার "সর্বহারা" দের শোনাও "ভাঙার গান"। বাজাও "অগ্নিবীণা"। প্রলয়উল্লাসের সেই গানে" প্রলয় শিখা" উঠুক জ্বলে। আমরা সবাই "দুর্দিনের যাত্রী", চারিদিকে "মৃত্যুক্ষুধা", "সন্ধ্যা"আসছে ঘনিয়ে। তাই "ভায়োলেনসের ভায়োলিন"বন্ধ করতে তুমি আমাদের সাহস দাও, শক্তি দাও, দাও বল এবং আত্মবিশ্বাস। সেই বিশ্বাসে ভর করে আমরা যেন তোমার মতো বলতে পারি "...আমি সেইদিন হবো ক্ষান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়গ কৃপান ভীম রণ ভূমে আর রণিবে না"। জানো কবি এখনও আমরা অত্যাচারী, দুর্নীতিগ্রস্থ শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাই। ভয় পাই তাদের অন্যায় কাজের সমালোচনা করতে। কারণ আমার চাকরি আছে যে, আছে ব্যবসা কিংবা মেয়ে একা কলেজে যায় অথবা ছেলে রাত্রি করে বাড়ি ফেরে।প্রতিনিয়ত একরাশ ভয় এবং রক্তচক্ষু আমাদের বিদ্রোহী সত্ত্বা কে লাগাম দিয়ে রেখেছে। তাই বল্গাহীন ঘোড়ার মতো প্রতিবাদে মুখর হতে পারে না আমাদের মন। পিঞ্জরাবদ্ধ বাঘের মতো শুধু চলে আস্ফালন। তোমার মতো "কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে" ফেলার মতো যদি আমরা আমাদের ভয়ের অর্গল ভেঙে পথে নামতে পারি তাহলে মণিকা, তাপসী, আসিফার আত্মা শান্তি পাবে। পেট ভরে দুবেলা খাবার পাবে তামাম ভারতবর্ষের না খেতে পাওয়া মানুষ। মাফিয়া, গুন্ডা, ধর্মান্ধ, মেকি দেশপ্রেমিদের দ্বারা রাজনীতির অঙ্গন আলোকিত হবে না। বরং"সর্বহারা"দের মাঝেই শোনা যাবে "সিন্ধুহিল্লোল"। "বুলবুল" গেয়ে উঠবে" দোলনচাঁপা'র গান। আমাদের "গুলবাগিচা"য় ফুটবে 'ঝিঙেফুল'। 'ঝিলিমিলি', 'আলেয়া' "শিউলি মালা" গেঁথে বরণ করে নেবে 'সাম্যবাদী' ও 'দুর্দিনের যাত্রী'কে। ----মনে পড়ে যায় নজরুল বলেছিলেন "আমাদের এমন একটি ছেলে দাও যে বলবে আমি ঘরের নই আমি পরের, আমি আমার নই, আমি দেশের "। আত্মোৎস্বর্গের এমন কামনা বাঙালি জীবনে সত্যিই বিরল। নজরুলের লেখায় শুধু বিদ্রোহের বাণী নেই আছে হৃদয়ের উত্তাপ ভরা সংজ্ঞা। আছে আবেগময় অনুভূতি। আছে প্রেম। সেইসব এলিমেন্টস অফ লাইফ কে তিনি বিশ্বাসের পাতাল থেকে সমন্বয়ের জীবন্ত রাজকন্যা কে উদ্ধার করে আমাদের সামনে এনে বলেছেন,

"হে মোর রানী

তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে

আমার বিজয় কেতন লুটায়

তোমার চরণতলে এসে "

কখনও বলেছেন

 "মোর প্রিয়া হবে এসো রানী

দেবো খোঁপায় তারার ফুল..."

কোনও পাশ্চাত্যনুসরণ নয় সম্পূর্ণ স্বদেশিয়ানায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তাই জীবনকে খুঁজেছেন মার্জিত রুচি বোধের এক অদ্ভুত রসায়নে। ঠিক সেইকারণেই কোনও অসত্য, অন্যায়ের এবং বিভেদের সাথে তিনি হ্যান্ডেশেক করতে পারেননি। বরং দেশ ও জাতির প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আমৃত্যু জেহাদ ঘোষণা করেছেন। তাই কবি অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন,

"ভুল হয়ে গেছে বিলকুল

আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে

ভাগ হয়নিকো শুধু নজরুল "।

যথার্থ এই উপলব্ধি সমস্ত বাঙালির হৃদয়ে থাক এবং তার কাব্য, কবিতা, নাটক ও জীবনাদর্শ হোক আমাদের আগামীদিনের পথ চলার পাথেয়। কবির ১২৩ তম জন্মদিনে এই কামনা জানিয়ে বলি 

 "আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে

এ জীবন পুন্য করো দহন দানে "।


                                             লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক





Post a Comment

0 Comments