চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

শতবর্ষে বর্ধমান ডিস্ট্রিক্ট রাইস মিলস অ্যাসোসিয়েশন # উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যের সেরা অদিশা দেবশর্মা, দশের মেধা তালিকায় ২৭২ জন # আধার কার্ডের ফটোকপির অপব্যবহার রুখতে বিজ্ঞপ্তি জারি # ইউনেস্কো'র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো # বাংলার চিকিৎসক উজ্জ্বল পোদ্দার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরার তালিকায়সরকারি কর্মচারীদের সুখের দিন শেষ, শ্রম কোড চালু হতে চলেছে সমগ্র ভারতে পশ্চিমবঙ্গে কোভিড বিধিনিষেধ প্রত্যাহার #পূর্ব বর্ধমান জেলায় মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এর উদ্যোগে খালবিল ও চুনোমাছ উৎসবের উদ্বোধন ২৫ ডিসেম্বর

"রাঙা হাসি রাশি রাশি"


 

"রাঙা হাসি রাশি রাশি"


🟣 বিশ্বরূপ দাস 



➡️ একদিকে করোনা ভাইরাস আর অন্যদিকে নাটুকে নির্বাচন। তারই মাঝে বাতাসে রঙের ঝিলিক বুলিয়ে দোল আসছে রঙিন মেঘের ভেলায় চেপে। সঙ্গে তার চৈত্র সেলের নানান উপহার। স্থলে -জলে- বনতলে কুড়িয়ে নিতে পারলেই হলো। তবে করোনার গ্রাফ উর্দ্ধমুখী,তাই পার্কের কোনে কোনে সেই চির পরিচিত রাঙা হাসি রাশি রাশি নেই। নেই কপোত কপোতীর 'বাতাসে বহিছে প্রেম' নয়নে লাগিল নেশার মতো নয়ন মনোহর দৃশ্য। তবে আড়ালে আবডালে যে যার নিজের মতো দোলের হাওয়ায় দুলছে সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একটু চোখ মেললেই দেখতে পাবেন ফাগুন হাওয়ায় ময়ূরীর মতো পেখম মেলেছে অষ্টাদশীর নীল, সাদা কিংবা হলুদ শাড়ি। খোঁপায় তার অশোক পলাশ। অদূরে পিচকারী হাতে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রাণহরি গোপ বালক। দেরি আর সয় না । রঙে রঙে তৃষিত জীবনকে দিতে হবে দোলের দোলা, হোলির মধুর আলিঙ্গন। তাই পি পি কিট, মাস্ক কে মাসখানেক ছুটি দিয়ে জীবনের নিকুঞ্জ বনকে মধুর বৃন্দাবন বানিয়ে ফেলতে তাদের দেরি হয় না। তবে এই বৃন্দাবনে বিশ্বামিত্র, দুর্বাসাদের প্রবেশ মানা। আজ দেশের সব শকুন্তলা, তাদের দুষ্মন্তদের সঙ্গে হোলি খেলবে। রুপাই সাজুও আবির দিয়ে নকশী কাঁথায় লিখে যাবে তাদের নাম। হৃদয়ের সব রঙ উজাড় করে হিন্দু ভাইটি মুসলিম ভাইয়ের প্রাণে মাখিয়ে দেবে। তারপর বিজয়া দশমী, ঈদ, গুড ফ্রাইডে আর বৌদ্ধ পূর্ণিমার রাতের মতো দোলের জ্যোৎস্নালোকিত সন্ধ্যায় আকাশ থেকে ঝড়ে পড়বে স্বর্গীয় সুরভী মাখা সুগন্ধি আবির। সেই আবিরে বাংলার সবুজ প্রান্তরে শুরু হবে নতুন বসন্ত। কোকিলের সুমধুর রাগিনীতে খুলে যাবে বদ্ধ মনের দুয়ার। উদার গৈরিক মাঠে ফলবে সোনার ধান । কৃষক বধূর ম্লান মুখ ফের রাঙা হয়ে পানে। বসন্তের বাসন্তী হাওয়ায় আমের বোলের গন্ধে ধন্য হবে ধরনীর বুক। মাছরাঙা ও তার ডানার রঙ দিয়ে জলের উপর লিখে যাবে জীবনের জয়গান। পিচকারির রঙে আর আবিরের সোনার কাঠির ছোঁয়ায় মানুষের অভাব যাবে ঘুচে। করোনার মতো মারণ ব্যাধি থেকে রেহাই পাবে বিশ্বের মানুষ । মৌমাছির গুঞ্জনে হাজার হাজার কিশলয়ের মাঝে প্রস্ফুটিত হবে কত না রঙ বে রঙের প্রসূন। কচি কাঁচাদের পবিত্র পাদস্পর্শে আর খিলখিল হাসির শব্দে পৃথিবীর সব স্বার্থপর দৈত্যের বাগানেও শুরু হবে বসন্তের আনাগোনা। তারাও তখন তাদের লোভ, অহংকার, কায়েমি স্বার্থ এবং ক্ষমতার আস্ফালন কে জলাঞ্জলি দিয়ে রঙের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে বলবে "থাক তবে ভুবনে /ধূলিমাখা চরণে /মাথা নত করে রবো/বসন্ত এসে গেছে /বসন্ত এসে গেছে ..."

অন্যদিকে প্রবাসী প্রেমিকার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় শুনতে পাওয়া যাবে তার সেই মন ভেজানো, প্রাণ জুড়ানো প্রেমের আর্তি,

"যাও যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও /তোমার আপন রাগে/তোমার গোপন রাগে /তোমার তরুণ হাসির অরুন রাগে /অশ্রু জলের করুন রাগে /রাঙিয়ে দিয়ে যাও " হ্যাঁ প্ৰিয় চেয়ে একবার দেখুন " নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগলো লাগলো /নীল দিগন্তে /বসন্তে সৌরভের শিখা জাগলো... তাই সেই নীল ফাগুনে সর্ষে খেতে ঢেউ হয়ে দোলের দোলায়, হোলির খেলায় মাতবার জন্য আপনাদের রইলো সাদর আমন্ত্রণ ।

একটু চেয়ে দেখুন ফাগুন সেজে ওঠেছে কৃষ্ণচূড়া আর পলাশের রঙে । নীল দিগন্তে দখিন হাওয়ার পালে লেগেছে সৌরভের ছোঁয়া। কচি কাঁচাদের রাশি রাশি রাঙা হাসি আর আমের বোলের গন্ধ যেন কানে কানে বলে যাচ্ছে '' বসন্ত এসে গেছে ''। শীতের শুষ্কতা আর গ্রীষ্মের রুক্ষতার মাঝে এ এক নির্মল প্রাকৃতিক আনন্দের সময়কাল। যেন শীতের প্রৌঢ়ত্ব এর অবসানে যৌবনের আগমন। যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জীবনের মধুমাসে প্রেয়সীর সান্নিধ্য লাভ। তাই সেই সুন্দরীর ছোঁয়ায় নিজের তনু মন প্রাণকে রাঙিয়ে তোলার জন্য কবি বলে ওঠেন '' খোল দ্বার খোল /লাগলো যে দোল /স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল ''। আসলে দোল হলো এমন এক উৎসব যা বহিরঙ্গে রঙের প্রলেপে অন্তর্জগতকেও রঙিন করে তোলে। এই রঙের খেলায় '' মনের কোনের সব দীনতা মলিনতা '' ধুয়ে মুছে যায়। উপলব্ধি হয় '' এক জাতি এক প্রাণের ''।

এই হোলি খেলার সাথে জড়িয়ে আছে পুরাণ ও ইতিহাসের কত না কাহিনী। আছে দৈত্যরাজ হিরন্যকশীপুরের বোন হোলিকার কাহিনী, পুতনা রাক্ষসীর কাহিনী, আছে মদনভস্মের কাহিনী ও সত্যযুগে মালিনী কন্যা ঢুনঢার কাহিনী। হোলির আগের দিন অশুভ শক্তিকে বিদায় জানিয়ে শুভ শক্তিকে বরণ করে নেবার জন্য কোথাও কোথাও ' ন্যাড়াপোড়া বা ছ্যাঁচরা পোড়া '' হয়। ছেলে পুলে এই ন্যাড়া পোড়াতে পোড়াতে বলে ওঠে '' আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া /কাল আমাদের দোল /পূর্ণিমা দিন চাঁদ উঠবে/বল হরিবোল''। তবে ব্রজধামে রাধা কৃষ্ণের রঙ্গের উৎসব সবার জানা । সেখানে আজও নজরুলের '' ব্রজ গোপী খেলে হোলি '' উন্মাদরঙ্গে। ধর্ম ও পুরাণের জীবন থেকে রংয়ের উৎসব যখন ইতিহাসের সরণি বেয়ে নেমে আসে আজকের আধুনিক জীবনে তখন তার ব্যাপ্তি আর তাৎপর্য হয়ে ওঠে নানারকম ।

 ১৯২৫ সালে বিশ্বভারতীতে শুরু হওয়া দোল উৎসব যেন আজ মহামানবের মিলন মেলা। যদিও দুবছর করোনার কারণে বন্ধ তবুও এ উৎসব যেন সব পাওয়ার এক শ্রেষ্ঠ পাওয়া। বর্তমানে রবীন্দ্রনাথের ভুনাগ রানীর (হোরিখেলা কবিতা ) মতো পাঠানবীর কেশর খাঁকে কেউ রংয়ের উৎসবে আমন্ত্রণ জানায় কিনা জানি না । জানি না হোলির নামে সে দিনের মতো আজও কোথাও প্রতিশোধের রঙ্গে রাঙ্গা হয় কিনা মাটি ! তবে মন বৃন্দাবনে কেউ রক্তের হোলি চায় না। চায় না প্রতিশোধের দোল। চায় কবিগুরুর '' বৈতালিক ''এর মতো এমন এক শুভ সন্ধ্যা যা এক বুক ভালোবাসা আর মিলনের ঝরনাধারা হয়ে একে অপরের হৃদয়কে রাঙ্গিয়ে দেবে আবির রঙ্গে। তবে যে যাই বলুক আধুনিক রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলাই বাংলার রংয়ের উৎসবের মুখ্য আকর্ষণ। যেন দ্বিতীয়ত ভ্যালেন্টাইস। রঙ্গের মাঝে মনের মানুষটিকে রাঙ্গিয়ে দেবার দিন। তাই রং বে রংয়ের আবির, জল রং, বেলুন, বাহারি টুপি, মুখোশ, পিচকারী নিয়ে সবাই মেতে ওঠে এই উৎসবে। স্বচ্ছ ডানা নিয়ে প্রজাপতি ও পাতায় পাতায় রং ছড়িয়ে দিয়ে যেন কানে কানে বলে ওঠে ''খেলবো হোলি রং দেবো না তাই কখনও হয় /এসেছে হোলি এসেছে''।

আমাদের ছোটবেলায় দোল ছিলো একটু অন্যরকম। ছিলো না ভালো রং, আবির। বাবা, কাকা বাঁশ কেটে ন্যাকড়া জড়িয়ে পিচকারী বানিয়ে দিতেন। রং বলতে আলতা কিম্বা ভূষো কালি, কলাপাতার কষ আর বাবলার আঠা। বড়রা কেউ কেউ বাঁদর মুখী রং ব্যবহার করতো। সকাল থেকেই চলতো বেশ তোড়জোড়। বন্ধুরা সব একজোট হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রং আবির দিয়ে আসতাম। কেউ কেউ সদ্য ওঠা আখের গুড় কিংবা নারকেল নাড়ু বা ঘুগনি খাওয়াতো । রং খেলতে খেলতে জামা কাপড় আর আস্ত থাকতো না। প্রায় সকলেই অর্ধনগ্ন হয়ে বাড়ি ফিরতাম। আর রং টা শেষ পর্যন্ত গাড়ির মোবিল কিম্বা কাদা পাঁকে পরিণত হতো। এমন অবস্থা হতো যে পুকুর ঘাটে (আয়না নিয়ে যাওয়া হতো ) নিজেকে নিজেই চিনতে পারতাম না। তারপর ঘন্টা খানেক ধরে পুকুরের জলকেও রং মাখিয়ে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল। মা বেচারী তখনও না খেয়ে আমার জন্য ভাত নিয়ে বসে আছেন। আর বাবা রক্তচক্ষু করে হাতে লাঠি নিয়ে তর্জন গর্জন করছেন। তখন ভয়ে প্রাণ যেতো শুকিয়ে। তারপর দাদু ঠাকুমার হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় রেহাই পেতাম॥ হোলির দিন বিকালে নাম সংকীর্তন বের হতো, আজও হয়। সেই সংকীর্তন দলে আমরা ছোটরা বাবার ধুতি পড়ে (বাবা পরিয়ে দিতেন ) আবির হাতে বেরিয়ে পড়তাম॥ মনে হতো চন্দ্রাতপের নীচে একটা সাদা সমুদ্র যেন আহ্লাদে আবির রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে খুশির ঢেউ তুলে গ্রামের পথে পথে ছুটে চলেছে। সঙ্গে সেই প্রাণ জুড়ানো মন ভুলানো গান ''আজ হোলি খেলবো শ্যাম তোমার সনে /একলা পেয়েছি তোমায় নিধু বনে '' আমাদের শৈশব কে এক অদ্ভুত দোলায় দুলিয়ে নিয়ে যেতো । আজ জীবনের অর্ধশতাব্দী প্রায় অতিক্রান্ত॥ জীবনে অনেক হোলি , অনেক দোলের দোলায় চেপে মেখেছি হাজার রংয়ের পদ্মরাগ মণির রং । তবুও মন চায় রং মাখতে , মাখাতে। হয়তো জীবনের দোলায় দুলতে দুলতে একদিন ফাগুন সেজে উঠবে শেষবারের মতো । তখনও জীবনের পলাশ বনে দাঁড়িয়ে আমি সবার উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলবো ''ও শ্যাম যখন তখন খেলো না খেলা অমন /ধরিলে আজ তোমায় ছাড়বো না /না না না ধরিলে আজ তোমায় ছাড়বো না "



Post a Comment

0 Comments