চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

হাওড়া-নিউ জলপাইগুড়ি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের যাত্রার সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী # ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়, ফ্রান্স কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ান মেসি # জয়েন্ট এন্ট্রান্স (মেইন) এর প্রথমভাগের পরীক্ষা ২৪ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত # বর্ধমান জেলা রাইস মিলস অ্যাসোসিয়েশন এর শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন # বাংলার চিকিৎসক উজ্জ্বল পোদ্দার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরার তালিকায় #সরকারি কর্মচারীদের সুখের দিন শেষ, শ্রম কোড চালু হতে চলেছে সমগ্র ভারতে # পশ্চিমবঙ্গে কোভিড বিধিনিষেধ প্রত্যাহার # #পূর্ব বর্ধমান জেলায় মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এর উদ্যোগে খালবিল ও চুনোমাছ উৎসবের উদ্বোধন ২৫ ডিসেম্বর

বাঙালির আবেগ— কিংবদন্তি সুভাষচন্দ্র

.                       ছবি : নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর সৌজন্যে।


বাঙালির আবেগ— কিংবদন্তি সুভাষচন্দ্র


 🟣 শিবানন্দ পাল


➡️ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুভাষচন্দ্র বসু একজন কিংবদন্তি নেতা। সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে তিনি ভারতকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে স্পষ্ট নয়। প্রতি বছর ২৩শে জানুয়ারি তাঁর জন্মদিনে সারা পৃথিবীতে কৌতুহল জাগে কী হয়েছিল তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে। আর এবছর তাঁর ১২৫তম জন্ম দিবসে বাঙালি আবেগ যে বৃদ্ধি পেয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই রহস্য নিরাময়ের জন্য একাধিক সরকারি ও বেসরকারি কমিশন তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। তাই আজও বিতর্কের শেষ হয়নি। সুভাষচন্দ্রের ভ্রাতুষ্পুত্রবধূ কৃষ্ণা বসু্-র বক্তব্য এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই।

"সায়গন থেকে মাঞ্চুরিয়া যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু যে প্লেনে উঠেছিলেন, সেটা তাইপের বিমানবন্দরে একটি দুর্ঘটনায় পড়ে। উনি খুবই অগ্নিদগ্ধ হয়েছিলেন এবং যে ডাক্তার দেখেছিলেন, তিনি আমাদেরও বলেছেন যে গভীরভাবে পুড়ে যাবার ফলে তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৪৫-এর ১৮ই অগাস্ট সন্ধ্যাবেলা।"

কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসুর বড় ভাই শরৎচন্দ্র বসুর কন্যা অধ্যাপিকা চিত্রা ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তাঁদের পরিবারের অনেকেই মনে করেন ওই বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষ বসুর মৃত্যু হয়নি।

"আমরা পরিবারের বেশি সংখ্যক লোক নানান ঘটনা শোনার পর এবং নানা খবরাখবরের ভিত্তিতে বিশ্বাস করি - ওই বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়নি।" 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর পূর্ব রণাঙ্গনে জাপানি সেনাবাহিনীর মনোবল যখন একেবারে তলানিতে, সেই সময়ে সুভাষচন্দ্র বসু জাপানিদের বিমানে সিঙ্গাপুর থেকে ব্যাংকক হয়ে সাইগনে পৌঁছেছিলেন।

কিন্তু সেখান থেকে এগোনোর জন্য আর অন্য কোনো জাপানি বিমান ছিল না। অনেক চেষ্টার পরে জাপানিদের একটি বোমারু বিমানে তিনি জায়গা পেয়েছিলেন। বিমানঘাঁটিতে তাঁকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের কয়েকজন সহকর্মী, তাঁদের সঙ্গে 'জয় হিন্দ' বলে করমর্দন করে অভিবাদন জানিয়ে তিনি বিমানে উঠেছিলেন। তিনি বিমানে ওঠার পরে অন্যদের 'জয়-হিন্দ' অভিবাদন জানিয়ে ওই বিমানে উঠেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু-র এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমান। 

সুভাষচন্দ্র বসু-র ওপরে 'লেইড টু রেস্ট' নামে বইয়ের লেখক, সাংবাদিক আশিষ রায় লিখেছেন, "বিমানটিতে ক্রু সহ ১৪ জন ছিলেন। পাইলটের ঠিক পিছনেই নেতাজি বসেছিলেন। তার সামনে পেট্রোলের বড় বড় জেরিক্যান রাখা ছিল। নেতাজির পিছনেই ছিলেন কর্নেল হাবিবুর। ... বিমানে চড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাপানিরা নেতাজিকে সহ-পাইলটের আসনে বসার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ তিনি বিনম্রভাবে ফিরিয়ে দেন। ঘটনা হল, সহ-পাইলটের আসনটি ছিল তাঁর মতো লম্বা মানুষের জন্যে বেশ ছোট।"

সাংবাদিক আশিষ রায়ের কথায়, "পাইলট আর লেফটেন্যান্ট জেনারেল শীদে ছাড়া বাকি সকলেই বিমানের মেঝেতেই বসেছিলেন। নেতাজিকে একটা ছোট কুশন দেওয়া হয়েছিল। কারও কাছেই সীট বেল্ট ছিল না।"

ওই বোমারু বিমানের ভেতরে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছিল সবার। তখনকার দিনে যুদ্ধবিমানে এয়ার কন্ডিশনার লাগানো থাকত না। প্রত্যেক হাজার মিটার ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানের তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি করে কমে যেত। ঠাণ্ডা আটকাতে সুভাষচন্দ্র বসু তার এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে তাঁর জ্যাকেটটা চেয়ে নিয়েছিলেন। দুপুর দুটো ৩৫ মিনিটে বোমারু বিমানটি জমি ছেড়ে আকাশে উড়েছিল।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি প্রয়াত অধ্যাপক অমলেন্দু দে বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, একটা বিশেষ মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন পড়াশোনা করতে। কিন্তু সেখান থেকে বড় ভাই শিশির বসুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন তিনি আইসিএস হতে চান না, এই সংবাদ বাঙালিদের উদ্বেলিত করেছিল। তাঁর কথায়—

"অতবড় লোভনীয় একটা পদ পরিত্যাগ করেছিলেন তিনি দেশের স্বার্থে। এটা বাঙালির মনে একটা তরঙ্গ সৃষ্টি করেছিল। বহুদিন ধরে বাঙালি আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশসেবা করার যে আদর্শ তুলে ধরেছিল, যার জন্য অগণিত লোক আন্দামানে নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন সেই ধারাটিকে আরও প্রজ্জ্বলিত করেন সুভাষচন্দ্র বসু।"

দেশে ফিরে চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে সুভাষচন্দ্র যোগ দেন স্বাধীনতার আন্দোলনে। 'স্বরাজ' নামে একটি সংবাদপত্র শুরু করেন এবং বঙ্গীয় প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির প্রচারণার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।  সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি হবার পর পরপর দুবার তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতিও নির্বাচিত হন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশ গ্রহণের কারণে অনেকবার তাঁকে জেল খাটতে হয়েছিল।

কিন্তু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত মতানৈক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন সুভাষচন্দ্র। অনেকেই মনে করেন গান্ধীজি সেইসময় তাঁর প্রতি অবিচার করেছিলেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান রজতকান্ত রায় বিবিসি বাংলাকে ওই একই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন "রবীন্দ্রনাথও সেই সময় গান্ধীজিকে বলেছিলেন যাতে সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস থেকে তাড়ানো না হয়। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সাধারণ বাঙালি পর্যন্ত সবার তখন একটা অনুভূতি হয়েছিল যে অন্যায়ভাবে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।"

উনিশশো তিরিশে সুভাষচন্দ্র বসু ইউরোপে পাড়ি জমান, যে সফরে তিনি ইটালির নেতা বেনিতো মুসোলিনি সহ বেশ কিছু ইউরোপীয় নেতার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি দেখেন বিভিন্ন দেশে কম্যুনিজম এবং ফ্যাসিবাদ কীভাবে কাজ করছে। এই সময়ে তাঁর ভাবনাচিন্তা নিয়ে তিনি লেখেন 'দ্য ইণ্ডিয়ান স্ট্রাগল' নামে একটি বইয়ের প্রথম পর্ব। সেখানে তিনি তুলে ধরেছেন ১৯২০ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। বইটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত হলেও ব্রিটিশ সরকার বইটি ভারতীয় উপমহাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

অধ্যাপক অমলেন্দু দে বলেছেন ছাত্রাবস্থা থেকেই সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন ব্যতিক্রমী। তরুণ প্রজন্মের কাছে বারবার তিনি তাঁর নেতৃত্বদানের ক্ষমতার জন্য একটি আদর্শ বা রোলমডেল হিসাবে বিবেচিত হয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে, এমনকি কলকাতা পৌরসভার মেয়র থেকে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সব ক্ষেত্রেই তিনি স্বতন্ত্র একটি চিন্তাধারার প্রমাণ রেখেছেন। তিনি শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন না।

কলকাতায় এলগিন রোডে তাঁদের পারিবারিক বাড়ির শোবার ঘর থেকে ১৯৪১ সালে শীতের রাতে তাঁর পালিয়ে যাবার ঘটনাটা ছিল ঐতিহাসিক। তাঁর পরিবারের অন্যতম সদস্যা কৃষ্ণা বসু-র কথায়, 

"বিশেষ রকমভাবে প্রহরায় ছিলেন সুভাষচন্দ্র, ...  তার ভেতর থেকে ওঁনাকে বের করে আমার স্বামী তাঁকে গোমো (বিহারে) স্টেশনে পৌঁছে দেন। গোমো থেকে ট্রেনে উঠে তিনি চলে যান পেশাওয়ার, পেশাওয়ার থেকে কাবুল, কাবুল থেকে মস্কো হয়ে পৌঁছান জার্মানিতে। সেখানে গিয়ে শুরু করেন আজাদ হিন্দ আন্দোলন।" তারপর জার্মানি থেকে সাবমেরিনে পৌঁছান জাপানে। সেখান থেকে সিঙ্গাপুরে গিয়ে গঠন করেন আজাদ হিন্দ সরকার।


কৃষ্ণা বসু-র কথায়, "সেটাই ছিল ভারতের বাইরে দেশের প্রথম অস্থায়ী স্বাধীন সরকার গঠন। সুভাষচন্দ্র বসু হয়েছিলেন সেই সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান এবং ৪৫ হাজার ব্রিটিশ ভারতীয় সেনা আত্মসমর্পণ করেছিল। তাদের নিয়ে গঠিত হয় ভারতের মুক্তি বাহিনী- ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল আর্মি (আইএনএ)। তিনি হয়েছিলেন তার সুপ্রিম কমাণ্ডার।" 


উল্লেখযোগ্য কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল মুহাম্মদ জামান কিয়ানি, মেজর জেনারেল শাহ নওয়াজ খান, কর্নেল প্রেম সেহ্‌‌গাল এবং কর্নেল শওকত মালিক। ক্যাপ্টেন ডাক্তার লক্ষ্মী স্বামীনাথন ছিলেন নারী সংগঠন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের মহিলা ব্রিগেড রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের কম্যান্ডের দায়িত্বেও ছিলেন। 

আজাদ হিন্দ সরকারের মন্ত্রীসভার অন্যান্য মন্ত্রীরা ছিলেন—

এস. এ. আইয়ার (সম্প্রচার ও প্রচারণা মন্ত্রী), 

লেফট্যানেন্ট কর্নেল এ. সি. চ্যাটার্জি (অর্থমন্ত্রী)।

আজাদ হিন্দ সরকারের সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রীরা ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিনিধি। এঁরা হলেন— লেফট্যানেন্ট কর্নেল আজিজ আহমেদ, এন. এস. ভগত, জে. কে. ভোঁসলে, গুলজারা সিংহ, এম. জেড. কিয়ানি, এ. ডি. লোকনাথন, এহসান কাদির এবং শাহনওয়াজ খান।

আজাদ হিন্দ সরকারের সংগঠন ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য একাধিক সচিব ও উপদেষ্টা নিযুক্ত ছিলেন। এঁরা হলেন—এ. এন. সহায় (সচিব), করিম ঘানি, দেবনাথ দাস, ডি. এম. খান, এ. এল্লাপা, জে. থিভি, সর্দার ইসের সিংহ প্রমুখ। এ. এন. সরকার ছিলেন সরকারের আইনি উপদেষ্টা। আজাদ হিন্দ সরকারে সচিব ও উপদেষ্টারা মন্ত্রীর সম-মর্যাদা পেতেন। সেটা তালিকায় এক পলক চোখ রাখলেই বোঝা যায় সুভাষচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি কীরকম ছিল।

সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহাসিক আহ্বান 'আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব' ভারত উপমহাদেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী বাহিনী ঝাঁসি রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছিলেন অরুণা চ্যাটার্জ্জি। পরবর্তীতে আইএনএ-র লেফটেন্যান্ট হয়েছিলেন তিনি। তাঁর কথায়—

"আমরা তখন বার্মাতে ছিলাম। সেখানে যখন যুদ্ধটা শুরু হল, তখন চারিদিকে গোলমাল। সেখানে আসলেন রাসবিহারী বসু, তারপর আসলেন নেতাজি। উনি এসে সেখানে ঝাঁসি রেজিমেন্টের একটা লিংক খুললেন। আমার মা তখন আমাকে লড়াই করার জন্য নেতাজির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। নেতাজি তখন আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ঝাঁসি ক্যাম্পের কমাণ্ডারের কাছে। শুরু হয়েছিল আমার প্রশিক্ষণ।"

আজাদ হিন্দ ফৌজের লেফটেন্যান্ট অরুণা চ্যাটার্জ্জি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আজাদ হিন্দ বাহিনীতে মেয়েদের পুরুষদের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিতেন সুভাষচন্দ্র বসু। বন্দুক পিস্তল থেকে শুরু করে বেয়নেট, মর্টার, কামান সবধরনের সমরাস্ত্র চালনার শিক্ষাই তিনি নারী বাহিনীর সদস্যদের দিয়েছিলেন। সামরিক বাহিনীর কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভূগোল, ইতিহাস সবকিছুর প্রশিক্ষণই ক্যাম্পে তাঁদের দেওয়া হতো। নেতাজি সবসময় না হলেও মাঝেমাঝেই নিজে এসে খোঁজ নিতেন কে কেমন শিখেছে, কেমন চলছে ক্যাম্প।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে লুকিয়ে ভারত ত্যাগ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান সফর, তাদের সহযোগিতায় ভারতে ব্রিটিশদের পর্যুদস্ত করা ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্দেশ্য। তিনি বার্লিনে বসবাস করেছিলেন ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নাৎসি জার্মানি ও জাপানের মত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের জন্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক ও রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্রের সমালোচনা করেছেন, এমনকি কেউ কেউ তাঁকে নাৎসি মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন বলেও অভিযুক্ত করেছেন। আবার অনেকে বলেছেন, জার্মানি আর জাপানের সঙ্গে হাত মেলানোর সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতারই পরিচয়। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল যে করে হোক ভারতকে সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে মুক্ত করা।

সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, কবে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের স্বাধীনতার অনুমোদন দেবে তার জন্য বসে না-থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সুবিধা নেওয়া উচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নির্ভর করে অন্য দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের উপর। আর তাই তিনি ভারতের জন্য একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। 

কলকাতায় নেতাজি ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিস-এর পরিচালিকা সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসুর কন্যা অধ্যাপিকা চিত্রা ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, 

"নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে প্রথমে আমরা গ্রহণ করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের একজন যোদ্ধা হিসাবে। সেভাবেই তাঁকে আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু ভারতের পূর্ব সীমান্তে আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে যে সংগ্রাম তিনি পরিচালনা করেছিলেন, সে সব খোঁজখবরের পরে দেখেছিলাম তিনি শুধু ভারতের মুক্তির সাধনাই করেননি, মুক্ত ভারতবর্ষ কীরকম হবে, তারও একটি ছবি তিনি বরাবর এঁকেছিলেন। ... তাঁর যে আদর্শ, যে ধ্যানধারণা তিনি ভবিষ্যতের জন্য রেখে গিয়েছেন, সেখানে তাঁকে আমরা একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি চিন্তাবিদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।" 

ভারত তথা বিশ্বের জনগণের অন্তরে নেতাজি চিরজাগরুক। কিন্তু বাঙালি অন্তরে তিনি হয়ে আছেন কিংবদন্তি সুভাষ। ১২৫ তম জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করে প্রণাম জানাই, তিনি থাকুন আমাদের অন্তরে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার- আজাদ হিন্দ ফৌজ— এস. এ. আয়ার। বিবিসি ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯ এবং ১৩ মার্চ, ২০২০।
         

Post a Comment

0 Comments