চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

হাওড়া-নিউ জলপাইগুড়ি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের যাত্রার সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী # ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়, ফ্রান্স কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ান মেসি # জয়েন্ট এন্ট্রান্স (মেইন) এর প্রথমভাগের পরীক্ষা ২৪ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত # বর্ধমান জেলা রাইস মিলস অ্যাসোসিয়েশন এর শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন # বাংলার চিকিৎসক উজ্জ্বল পোদ্দার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরার তালিকায় #সরকারি কর্মচারীদের সুখের দিন শেষ, শ্রম কোড চালু হতে চলেছে সমগ্র ভারতে # পশ্চিমবঙ্গে কোভিড বিধিনিষেধ প্রত্যাহার # #পূর্ব বর্ধমান জেলায় মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এর উদ্যোগে খালবিল ও চুনোমাছ উৎসবের উদ্বোধন ২৫ ডিসেম্বর

সৌরভময় ট্যাক্সি ড্রাইভার


 

সৌরভময় ট্যাক্সি ড্রাইভার


🟣  বিশ্বরূপ দাস 


 ➡️  জীবনের কুরুক্ষেত্রে যারা শত প্রতিবন্ধকতার মাঝে নীরবে লড়াই করে সমাজের বুকে ছড়িয়ে যায় সৌরভ সুগন্ধ তাদেরই একজন সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এই সৌরভ বিশেষ কোনও কেউকেটা নয়, নয় কোনও রাজনৈতিক বা সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। নিতান্ত ছাপোষা মানুষ।সাধারণ। অতি সাধারণ পূর্ব বর্ধমান শহরের এক ট্যাক্সি ড্রাইভার। যে আর পাঁচজনের মতো স্বপ্ন দেখেছিল। ভেবেছিল লেখাপড়া শিখে সরকারি চাকরি করে বৃদ্ধ বাবা মায়ের পাশে দাঁড়াবে। সেই মতো শুরু হয়েছিল লেখাপড়া। বর্ধমান সি এম এস স্কুলে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক (১৯৯৫) ও উচ্চ মাধ্যমিক(১৯৯৭) পাশ করে সৌরভ ভর্তি হয় যাদবপুর ইনভার্সিটিতে। সেখান থেকে ২০০২ সালে জুলজিতে অনার্স নিয়ে প্রথম বিভাগে সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়। সেইবছরেই স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে লাভ করে ডি.এম. এল. টি ডিগ্রি। সেখানেও প্রখর বুদ্ধি মত্তায় ছিনিয়ে নেয় শ্রেষ্ঠত্বের আসন। আসে সম্মান। তারপর ২০০৩ সাল থেকে তিনি দীর্ঘ সাত বছর ফ্রাঙ্কো ইন্ডিয়ান, আগুমেন্টইসের মতো প্রখ্যাত প্রখ্যাত ঔষধ কোম্পানিতে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টটিভের কাজ করেন। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনে দুর্ঘটনা ঘনিয়ে আসে। রোড এক্সিডেন্টে বাঁ পা'টি সম্পূর্ণ রূপে অকেজো হয়ে যায়। ডাক্তারবাবু জানিয়ে দেন এই পা নিয়ে আর কোনোদিন বাইক চালানো সম্ভব নয়। সেই দুর্ঘটনার কারণে তার কাজ চলে যায়। কর্মহীন সৌরভ পূনরায় জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে থাকেন। একটু সুস্থ হলে একবুক স্বপ্ন নিয়ে একের পর এক চাকরির পরীক্ষায় ও বসেন। সব কটি পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে পাশ করলেও শেষ রক্ষা হয় না। কারণ পরীক্ষকদের টাকার লোভ মেটাবার ক্ষমতা ছিল না সৌরভের। ছিল না ঘুষ দিয়ে চাকরি করার মানসিকতা। তাই বর্ধমান মেডিকেল কলেজে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেও ৩ লাখ টাকা উৎকোচ (২০১২ সালে) দিতে না পারায় তার হওয়া চাকরিটা আর হয়নি। সেদিন থেকে সৌরভ প্রতিজ্ঞা করে এই ঘুণ ধরা সমাজে আর কোনদিন চাকরির পরীক্ষায় বসবে না। বরং যারা ঘুষ চেয়েছে তাদেরকে নিজের পিছনে বসিয়ে কান ধরে টেনে নিয়ে যাবে মাইলের পর মাইল। সেই ভাবনা মাথায় আসার সাথে সাথে প্রথাগত পড়াশুনার পর্ব লাটে তুলে স্কুলের ফার্স্ট বয় সৌরভ মোটর ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি হয়। প্রতিভা যার দেবদত্ত তার কোনও জিনিষ আয়ত্ত করতে সময় লাগে না। অন্তরের নিষ্ঠা, একাগ্রতা আর অধ্যবসায়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মোটর ড্রাইভিং-এ হাত পাকিয়ে ফেলে সৌরভ। পেয়ে যায় ড্রাইভারের লাইসেন্স। ইতিমধ্যে পিতা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। মা-ও অসুস্থ। বাবার বুকে পেশ মেকার বসাতেই হবে। ডাক্তারবাবুরা জানিয়ে দিয়েছেন পেশ মেকার না বসালে বাবাকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু এরমধ্যে বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে এবং ছোটখাট ব্যবসা করতে গিয়ে বাজারে প্রচুর টাকা ঋণ ও হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় টাকা কোথা থেকে আসবে। মাথার মধ্যে পাহাড় প্রমাণ দুশ্চিন্তা। রাতে ঘুম আসে না। এইসময় সৌরভ এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক করে বর্ধমানে পাওয়ার হাউস পাড়ার একমাত্র বসতবাড়ি বিক্রি করে বাবার চিকিৎসা করাবে এবং সংসারের দেনা মেটাবে। তারপর বাকি টাকায় গাড়ি কিনে জীবনধারণের অন্ন জোগাবে। সেই মোতাবেক শুরু হয় তার নতুন জীবন অভিসার। বাড়ি বিক্রির চিকিৎসায় ২০১২ সালে বাবার বুকে পেস মেকার বসে। তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। মেটানো হয় পারিবারিক দেনা। তারপর বাকি টাকায় সৌরভ চার চাকা একটা গাড়ি কিনে সেইসব ঘুষখোর কর্তা ব্যক্তিদের নিজের পশ্চাতে বসতে বাধ্য করেন।




ইচ্ছে করলে সৌরভ যেকোনও সরকারি চাকরি অনায়াসে পেতে পারতো। আজও পেতে পারে। হ্যাঁ আজও। সে কৃতিত্ব ও দক্ষতা ওর আছে। কিন্তু তার ঘেন্না ধরে গ্যাছে। ওপথে সে আর হাঁটতে চায় না।ছোট হোক, ইনকাম কম হোক, তবু সে তার ছোট্ট পরিবারকে নিয়ে সুখে আছে। শান্তিতে আছে। তার উপর খবরদারি করবার কেউ নেই। নালিশ জানাবার কেউ নেই। সে নিজেই নিজের মালিক। সে কাউকে ঘুষ দেয় না, নেওয়ার প্রশ্নও আসে না।সততা তার স্বভাবধর্ম। দায়িত্ব, কর্তব্য, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা তার অলঙ্কার। ছাত্র হিসেবে সে যেমন সফল ছিল, ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবেও ততখানি সফল। খুব সুন্দর হাত। আপনি বললেও কখনও নিজের স্পিড লিমিটের বাইরে যায় না। ট্যাক্সি চালাতে চালাতে ফোনালাপ করে না। কাউকে অযথা ওভারটেক করে নিজের বিপদ ডেকে আনার মানসিকতা ওর নেই। আপনি একা থাকলে ট্যাক্সিতে সর্বক্ষণ আপনাকে সঙ্গ দেবে। শোনাবে মিষ্টি মধুর রবীন্দ্র সংগীত, নজরুলগীতি থেকে শুরু করে মার্জিত আধুনিক বাংলা হিন্দি গান।

সৌরভের ছোট্ট একটা মেয়ে আছে। ক্লাস ফাইভে পড়ে। কয়েক বছর আগে বেলুড়ে দুর্গা পূজার সময় কুমারী পূজায় মহারাজরা জগৎ মাতা হিসাবে মেয়েটিকে পূজা করেন। মেয়েটি বাবার মতো যথেষ্ঠ বুদ্ধিমতী ও গুণবতী। ওকে ঘিরেই সৌরভের এক পৃথিবী স্বপ্ন। তবু আশঙ্কা জাগে ওর মনে। লেখাপড়া শিখিয়েও কি শেষ পর্যন্ত মেয়েটি পাবে তার মর্যাদা। পাবে কি পাবে না তা সময়ই বলবে। আমরা আশাবাদী। আশাবাদী সৌরভও। হারার আগে হারতে রাজি নয় সে। স্কুলে পরীক্ষার খাতায় অনেক দাদাগিরি সে দেখিয়েছে। এখন দাদাগিরি করছে স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে। ঘন্টায় ১০০/১১০ কিলোমিটার গতিবেগে ছুটে যাচ্ছে জনাকীর্ণ শহরের উপর দিয়ে। দায়িত্ব অনেক ।যথাসময়ে আরোহীদের পৌঁছে দিতে হবে লক্ষ্যে। নইলে পরবর্তী দিনে আর ভাড়া আসবে না। ফ্লাইট মিস হলে আর রক্ষে নেই। তাই রানারের মতো সৌরভও প্যাসেঞ্জারের বোঝা নিয়ে ছুটে চলে শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে। ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে এলেও উপায় নেই। যাত্রীদের স্বার্থ তার কাছে বড় স্বার্থ। তাই তাকে মাঝে মধ্যেই বিনিদ্র রজনী যাপন করতে হয়। ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে আবার সে ছুটে চলে। যাত্রাপথকে আনন্দ মুখর করে রাখার জন্য সদালাপী, মিশুকে, ভদ্র, বিনয়ী সৌরভের প্রচেষ্টার অন্ত থাকে না। পরিশীলিত, পরিমার্জিত ভাষায় গল্প গুজব এবং রসিকতায় সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখতে ওর জুড়ি নেই। বাচ্ছাদের ও ভীষণ ভালোবাসে। মজার মজার গল্প আর ক্যুইজে বাচ্ছারা পথের গ্লানি ভুলে গিয়ে এক আনন্দময় জগতে বিচরণ করে।কিছুক্ষণ ওর সাথে গেলেই যে কেউই বুঝতে পারবেন কীরকম ট্যালেন্টেড ছেলে ও। মনে হবে আপনি এক চলমান জ্ঞান ভান্ডারের সঙ্গে প্রমোদ ভ্রমণে বেরিয়েছেন। কি জানে না সৌরভ। বিজ্ঞান থেকে পুরান, রামায়ণ-মহাভারত থেকে মঙ্গলগ্রহ অভিযান, জীবনবিজ্ঞান থেকে ইতিহাস, ভূগোল সবই যেন ওর নখদর্পনে। শ্রদ্ধায় আপনার মাথাও নত হয়ে যাবে। যতই অজানা অচেনা জায়গা হোক ভ্রমণপথে সৌরভকে পথের দিশা সম্বন্ধে কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হয় না। প্রখর আত্মবিশ্বাসের সাথে আধুনিক টেকনোলজির সবটুকু সুবিধা আদায় করেই ছাড়ে নিজের সহজাত পান্ডিত্য দিয়ে।




শুধু নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার পরে যখন অন্যান্য ড্রাইভারদের কর্তব্য শেষ হয়ে যায় তখন সৌরভের আর এক দায়িত্ব শুরু হয়। প্রয়োজনে তাদের হোটেল খুঁজে দেওয়া, রান্না করে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা অক্লেশে নিজের মাথায় তুলে নেয়। হাসতে হাসতে আপনার লাগেজটি কাঁধে করে পৌঁছে দেয় হোটেলের ঘরে। না এর জন্য বাড়তি কোনও পয়সার ডিমান্ড করে না সৌরভ। চায় শুধু একটুকু নির্ভেজাল ভালোবাসা আর সহানুভূতি।


লক ডাউনের দিনে, করোনার ভয়ে অন্যান্য ড্রাইভাররা যখন প্রাণভয়ে ঘরে সিঁটকে বসে আল্লাহ কে ডেকেছে কিংবা হরিনাম জপ করেছে সেইসময় সৌরভ নিজের এবং নিজের পরিবারের কথা না ভেবে সংক্রমিত রোগীদের পৌঁছে দিয়েছে হসপিটালে। স্বাস্থ্য কর্তাদের পৌঁছে দিয়েছে এক শহর থেকে আর এক শহরে। শুধু তাই নয় লক ডাউনের দিনে গ্রামের কর্মহীন পরিযায়ী শ্রমিকদের সাহায্য করেছে নিজের সাধ্যমতো। এছাড়াও যাত্রীদের ফেলে যাওয়া মূল্যবান জিনিষ সৌরভ বহুবার তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। এহেন নির্লোভ,পরোপকারী, সৎ, শিক্ষিত, দায়িত্বশীল, মানবিক মূল্যবোধের অন্যতম প্রতীক সৌরভদের জন্য কি কিছুই করতে পারি না। অন্ততঃ প্রাণভরা ভালোবাসা তো দিতে পারি। ওদের জন্য লিখতে পারি একপৃথিবী। সত্যি করে বলছি ডাক্তার নয়, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর নয়। আগামীদিনে ঘরে ঘরে সৌরভের মতো এরকম মানুষের মতো মানুষ জন্মগ্রহণ করুক এই কামনা করি। শপথ করে বলছি সৌরভের মতো ছেলে পেলে আমি একজনকে নয়, একুশজনকে পালতে রাজি আছি। 

ভালো থেকো সৌরভ, ভালো থেকো। ঠিক এইভাবেই তুমি তোমার সৌরভ ছড়িয়ে আমাদের পারিপার্শ্বিক জগৎকে সুরভিত করো। শুভ কামনা রইলো।


Post a Comment

0 Comments