চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

নক্ষত্রপতন : শন কোনারি ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়


 

নক্ষত্রপতন : শন কোনারি ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়


 🔸 অভিজিৎ মিত্র


➡️  ৩১শে অক্টোবর ও ১৫ই নভেম্বর। ঠিক ১৫ দিনের তফাৎ। আমাদের ছেড়ে একে একে চলে গেলেন দুজন বর্ষীয়ান অসামান্য অভিনেতা, শন কোনারি (২৫ অগস্ট ১৯৩০ – ৩১ অক্টোবর ২০২০) এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৫ – ১৫ নভেম্বর ২০২০)। একজন হলিউডের দিকপাল, আরেকজন বাংলা সিনেমার।

দুজনের বয়সের তফাৎ পাঁচ বছর, সিনেমার কেরিয়ারও শুরু পাঁচ বছরের তফাতেই। দুজনেই বাছাই করে সিনেমায় অভিনয় করেছেন, একজন প্রায় একশ, অন্যজন প্রায় দুশ দশ। একজন যখন ১৯৬২ সালে জেমস বন্ড হিসেবে গোটা পৃথিবীকে মুগ্ধ করছেন, অন্যজন সেই সময় ‘নরসিং’ চরিত্রে ভারতের সিনেমা প্রেমীদের নিজের ক্লাস চেনাচ্ছেন। আর ১৯৭৪-এ গিয়ে উনিও হয়ে উঠছেন ভারতের শার্লক হোমস – ফেলুদা। প্রচুর মিল দুজনের ভেতর। সিনেমা বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও। ফলে মনে হল, লিখলে একসঙ্গে দুজনকে নিয়েই লেখা উচিৎ। এক সারিতে রেখে।  

 শিশির ভাদুড়ি সৌমিত্রকে ওনার কেরিয়ারের একদম শুরুর দিকে বলেছিলেন, অভিনয়ের আগে চরিত্র বাছবে একদম গোয়েন্দার মত, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, নিজেকে কতটা ভাঙতে পারছ সেই দেখে। কথাটা কিন্তু শন কোনারি আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দুজনের গোটা কেরিয়ার জুড়ে বাহন হিসেবে থেকেছে। শন ইচ্ছে করলেই শুধুমাত্র জেমস বন্ড হিসেবে অভিনয় চালিয়ে যেতে পারতেন। সৌমিত্র ইচ্ছে করলে বানিজ্যিক ছবির ম্যান-নেক্সট-ডোর হিরো ইমেজে ঢুকে গিয়ে আর মাঝে মাঝে ফেলুদা হিসেবে গোটা কেরিয়ার টেনে নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু এরা কেউই সেই ‘মেথডিকাল’ রাস্তায় হাঁটেন নি। নিজেকে বারবার ভেঙেছেন। আরো অবাক লাগে, দুজনেই পরিনত বয়সে বেশি করে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন বিভিন্ন চরিত্রে। আসলে একজন জাত অভিনেতাকে চেনা যায় তার গোটা কেরিয়ারে উনি কত রকমের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, ওনার কাজ কতবার দর্শকের মনে দাগ কেটেছে আর চরিত্রের জন্য উনি নিজেকে কতটা তৈরি করছেন, সেই দেখে। সেদিকে দেখলে শন এবং সৌমিত্র, দুজনকেই ‘ক্লাসিক’ হিসেবে ফুল মার্কস দিতে হয়।



শন কোনারির কেরিয়ার শুরু ১৯৫৪ সালে, ‘সাইমন’ নামক এক শর্ট ফিল্মে পুলিশের অভিনয় দিয়ে। ভরাট গলার জন্য এরপর ওনাকে টিভির বিভিন্ন চরিত্রাভিনয় মূলক ছবিতে বেশি দেখা যেত। ব্লাড মানি (১৯৫৭), আর্মচেয়ার থিয়েটার (১৯৫৮), অ্যান এজ অফ কিংস (১৯৬০), ম্যাকবেথ (১৯৬১), আলেকজান্ডার (১৯৬১) ইত্যাদি। ওনার কেরিয়ারে সঠিক অর্থে প্রথম ব্রেকথ্রু হল ‘দ্য ফ্রাইটেন্‌ড সিটি’ (১৯৬১)। এই সিনেমায় শন ছিলেন এক চোরের ভূমিকায়। এখান থেকে উনি সবার কাড়েন। তারপর তো ইতিহাস। ১৯৬২ সালে জেমস বন্ডের প্রথম অভিনয় করেন ‘ডক্টর নো’ ছবিতে। পরের বছর ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ্‌ লাভ’, ৬৪ সালে ‘গোল্ড-ফিঙ্গার’, ৬৫ সালে ‘থান্ডারবল্‌’ আর ৬৭ সালে ‘ইউ অনলি লিভ টুয়াইস’। গোটা পৃথিবী জেমস বন্ড হিসেবে ওনার মুখটাই দেখতে শুরু করে, ওনাকেই ঐ চরিত্রে আইডল হিসেবে বসিয়ে দেয়। কিন্তু শন ছিলেন অন্যরকম। এই কমফর্ট জোন ছেড়ে উনি মাঝে মাঝেই অন্যান্য চরিত্রে কাজ করতে চাইতেন। ‘ওম্যান অফ স্ট্র’ (১৯৬৪) সিনেমায় এক ধনকুবেরের ভাইপোর ভূমিকায়, ‘মার্নি’ (১৯৬৪) ছবিতে আগলে রাখা স্বামীর ভূমিকায়, ‘দ্য হিল’ (১৯৬৫) ফিল্মে এক অবাধ্য কয়েদির চরিত্রে, ‘এ ফাইন ম্যাডনেস’ (১৯৬৫) ছবিতে এক কবি হিসেবে – উনি এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। এবং ১৯৬৭ সালের পর জেমস বন্ডের চরিত্র থেকে সরে আসার পর দুর্দান্ত ও অবিস্মরনীয় চরিত্রগুলো উনি একে একে উপহার দিতে শুরু করেন। ‘দ্য অফেন্স’ (১৯৭৩), ‘দ্য ম্যান হু উড বি কিং’ (১৯৭৫), ‘আউটল্যান্ড’ (১৯৮১), ‘দ্য আনটাচেবল্‌স’ (১৯৮৭), ‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’ (১৯৯০) ইত্যাদি। ‘দ্য আনটাচেবল্‌স’ সিনেমায় এক পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য অস্কার পুরস্কার পান। এদিকে শনকে ছেড়ে দেবার পর জেমস বন্ডের দর্শকসংখ্যা প্রায় তলানিতে ঠেকেছিল কারন দর্শকরা শনকেই বন্ডের চরিত্রে দেখতে চাইত। ফলে ওনাকে আবার ১৯৮৩ সালে জেমস বন্ড হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। ‘নেভার সে নেভার এগেইন’ ছবিতে। অবশ্য ওনার মত বড় মাপের অভিনেতাকে যে জেমস বন্ডের মধ্যে আটকে রাখা যাবে না, সেটা সবাই বুঝে গেছিল। উনিও তারপর আর জেমস বন্ডে আগ্রহ দেখান নি। বরং কখনো এক মধ্যযুগের যুক্তিবাদী রহস্যভেদী হিসেবে (দ্য নেম অফ দ্য রোজ, ১৯৮৬), এক বৈজ্ঞানিকের চরিত্রে (মেডিসিন ম্যান, ১৯৯২), হার্ভার্ড প্রফেসরের ভূমিকায় (জাস্ট কজ, ১৯৯৫) আবার কখনো এক উচ্চবর্গের চোরের গুরু হিসেবে (এনট্র্যাপমেন্ট, ১৯৯৯) অভিনয় করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। শেষবার অভিনয় করেছেন ২০০৩ সালে, ‘দ্য লিগ অফ এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টলমেন’ ছবিতে। এরপর সিনেমা থেকে সরে যান। কিন্তু যতদিন সিনেমা করেছেন, নিজের জন্য চরিত্র বেছেছেন গোয়েন্দার মত, নিজেকে যতভাবে ভাঙতে পারেন তার জন্য। এবং বন্ডের রোল বাদে কেউ যদি মনোযোগ দিয়ে ওনার কয়েকটা হবি দেখেন – দ্য ম্যান হু উড বি কিং, আউটল্যান্ড, দ্য নেম অফ দ্য রোজ, দ্য আনটাচেবল্‌স, দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর – বুঝতে পারবেন চরিত্রাভিনেতা হিসেবে শন কেমন ছিলেন।



সৌমিত্রর সিনেমা কেরিয়ার শুরু ১৯৫৯ সালে, ‘অপুর সংসার’ দিয়ে। আমার কিন্তু ‘অপুর সংসার’, ‘দেবী’ আর ‘তিনকন্যা’-য় ওনার অভিনয় তেমন দারুন লাগে নি। এইসব সিনেমায় আসলে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনার মুন্সিয়ানা (আর দেবী-তে ছবি বিশ্বাসের উপস্থিতি) এতটাই ছিল যে আলাদা করে কোন অভিনেতা অভিনেত্রী জায়গা করতে পারেননি। বারবার মনে হত, সত্যজিৎ রায় সবার থেকে সেরাটাই বের করে আনছেন। সৌমিত্রকে প্রথমবার আমার ভাল লাগে ‘ঝিন্দের বন্দি’-তে। আগের সিনেমাগুলোর মধ্যবিত্ত ঘরের সাধারন ছেলের চরিত্র থেকে বেরিয়ে এক খলনায়কের ভূমিকায়, তাও আবার কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকা উত্তম কুমারের উল্টোদিকে, সেই সাহসিকতা আমায় ছুঁয়ে গেছিল। এরপর সৌমিত্রকে অসাধারন লাগে ১৯৬২-র ‘অভিযান’ ছবিতে। ঐ জ্বলন্ত চোখ কোনদিন ভোলা যায় না। তারপর ‘চারুলতা’র প্রেমিক আর ‘আকাশ কুসুম’-এর অজয়। ১৯৭৩-এ ‘অশনি সঙ্কেত’। এগুলো বাঙালির অল-টাইম ভাললাগার লিস্টে রয়েছে। কিন্তু অভিযান-এর সেই শক্ত চোয়াল আর বুদ্ধিদীপ্ত জ্বলন্ত চোখ পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে এক অন্য ডাইমেনশনে চলে যায় ফেলুদা চরিত্রে। ‘সোনার কেল্লা’। বাঙালি পেয়ে যায় তার নিজের শার্লক হোমস। যে শন কোনারির জেমস বন্ডকে চোখে চোখ রেখে টক্কর দিতে পারে। আমার মনে হয়, এই ছবির পরেই সৌমিত্র ঢুকে যান বাংলা ছবির কিংবদন্তির তালিকায়, উত্তমকুমারের পরেই। কিন্তু নায়ক হিসেবে অভিনয় করে সৌমিত্র কখনোই নিজেকে গন্ডীবদ্ধ করে তোলেন নি। নিজেকে বারবার ভেঙেছেন। অন্যরকম চরিত্র করতে চেয়েছেন। ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘ঘরে বাইরে’ বা ‘কোনি’র ক্ষিদদা, এগুলো সব আলাদা ধরনের চরিত্র। আবার ১৯৮৬-র ‘আতঙ্ক’র মাস্টারমশাই আর ১৯৮৯-এর ‘গণশত্রু’র ডাক্তার, দুটো একদম বিপরীত মেরুর চরিত্র। ‘শাখা প্রশাখা’ও তাই। যে সিনেমার জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, ‘পদক্ষেপ’, সেই চরিত্রও অন্যরকম। আসলে সৌমিত্র কখনোই টাইপ কাস্টেড না হয়ে সারাজীবন নিজেকে ভেঙে নতুন করে তৈরি করেছেন, নিজেই নিজের পরীক্ষা নিয়েছেন, বিভিন্ন রকম চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গেছেন। ‘দেবী’র অসহায় স্বামী থেকে ‘সাত পাকে বাঁধা’র সিরিয়াস স্বামী, ‘তিন ভুবনের পারে’র জীবনে কি পাবনা গানের সঙ্গে টুইস্ট ডান্স, ‘বসন্ত-বিলাপ’-এর স্ল্যাপস্টিক কমেডি, ‘সোনার কেল্লা’য় ‘আছে আছে আছে, আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে’ বলে আনন্দে মেতে ওঠা, উদয়ন পন্ডিতের চোয়ালচাপা ‘দড়ি ধরে মারো টান রাজা হবে খানখান’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’এর স্নানঘাটে বন্দুক হাতে প্রতিশোধকাঙ্খী গোয়েন্দা, ‘আতঙ্ক’র অসাধারন ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন, এমনকি ‘শাখা প্রশাখা’য় কিছু না বলেও চেয়ারের হাতলে প্রতীকি ঘুঁষি মেরে যাওয়া – এভাবে সৌমিত্র বারবার চরিত্র থেকে চরিত্রে বদলে যাওয়া দেখিয়েছেন, একজন অসামান্য অভিনেতার ঠিক যা যা গুণ থাকা উচিৎ। আসলে উনি কখনো নায়ক বা ফেলুদা হিসেবে বাঁচতে চাননি, উনি দর্শকের মনে বাঁচতে চেয়েছেন সৌমিত্র হিসেবে, এক চরিত্রাভিনেতা হিসেবে।  

শন ভাগ্যবান। নিজের অভিনয় প্রতিভার মূল্য হিসেবে সেরা অভিনেতা বিভাগে অস্কার পেয়েছেন, গোল্ডেন গ্লোব পেয়েছেন, বাফটা পেয়েছেন। স্যাটার্ন অ্যাওয়ার্ড, ইউরোপিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড, জার্মান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড, লন্ডন ক্রিটিক ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড, নিউ ইয়র্ক ক্রিটিক ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড, লরেল অ্যাওয়ার্ড ... এরকম অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন। সৌমিত্র তুলনামূলকভাবে হতভাগ্য। প্রায় সমান প্রতিভার অধিকারী হয়েও শুধুমাত্র বাংলার অভিনেতা হবার জন্য এসব কিছুই পেলেন না। এমনকি সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেলেন জীবনের প্রায় অন্তিম সময়ে, ২০০৮ সালে, ৭৩ বছর বয়সে। দাদাসাহেব ফালকে বা পদ্মবিভূষন, সেগুলোও জীবনের শেষদিকে। একজন চিত্র সমালোচক হিসেবে আমি মনে করি, ওনার অন্তত একবার অস্কার (অভিযান), একবার গোল্ডেন গ্লোব (চারুলতা) আর একবার কান ফিল্ম ফেস্টিভাল (অশনি সঙ্কেত) পুরস্কার পাওয়া উচিৎ ছিল। আর জাতীয় পুরস্কার কোন্‌ সালে পাওয়া উচিৎ ছিল? সেটা নিয়ে মন্তব্য না করাই ভাল। তবে এটাও ঠিক, সৌমিত্র সারাজীবন ছিলেন প্রতিবাদী। দুবার পদ্মশ্রী পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই সেটা বোঝা যায়। নিজের জন্য অন্যরকম চরিত্র বাছতে যতটা ভালবাসতেন, পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড়াতে হয়ত ততটা ইচ্ছে জাগত না।

হ্যাঁ, বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্রাভিনেতার পাশাপাশি আমার চোখে শন আর সৌমিত্র, দুজনেই আইডিয়াল গোয়েন্দা। এক সারির। পেটানো চেহারা, লম্বা, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, শক্ত চোয়াল, মাপা কথা, ঠোঁটের কোণে ঝোলানো হালকা হাসি, অনবদ্য অভিনয় - এদের ছাড়া অন্য কাউকে জেমস বন্ড আর ফেলুদা চরিত্রে আমার দেখতে ইচ্ছে করে না। হয়ত এই লেখার শিরোনাম কেটে আমাকে যদি আরেকটা বিকল্প লিখতে বলা হয়, একটাই নাম হাত দিয়ে বেরোবে।

‘জেমস বন্ড এবং ফেলুদা আর নেই’।  


(লেখক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যক্ষ)