চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যের সেরা অদিশা দেবশর্মা, দশের মেধা তালিকায় ২৭২ জন # মাধ্যমিকে যুগ্ম প্রথম বর্ধমান সিএমএস হাই স্কুলের রৌনক মন্ডল এবং বাঁকুড়ার রাম হরিপুর রামকৃষ্ণ মিশনের অর্ণব ঘড়াই # আধার কার্ডের ফটোকপির অপব্যবহার রুখতে বিজ্ঞপ্তি জারি # ইউনেস্কো'র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো # বাংলার চিকিৎসক উজ্জ্বল পোদ্দার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরার তালিকায়মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকেও তাক লাগালো কাটোয়ার অভীক পশ্চিমবঙ্গে কোভিড বিধিনিষেধ প্রত্যাহার #১০০ দিনের কাজের বকেয়া টাকা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের আন্দোলন

চলুটেকা ব্রীজ ও ধ্বংসের উৎসব


 

চলুটেকা ব্রীজ ও ধ্বংসের উৎসব


অভিজিৎ মিত্র


➡️ আগস্ট মাসে এক বন্ধু বেশ সুন্দর এক সোসাল মিডিয়া পোস্ট পাঠিয়েছিলেন। মে মাসে বিজনেস ওয়ার্ল্ডে প্রকাশিত প্রকাশ আইয়ারের এক ছোট কিন্তু যথাযথ লেখা – ‘দ্য ব্রীজ অন দ্য রিভার চলুটেকা’। সেই লেখা দিয়েই আমার এই গদ্য শুরু করি।

আমেরিকার হন্ডুরাস শহরের চলুটেকা নদীর পাশে ৪৮৪ মিটার লম্বা এক ব্রীজ আছে যার দু’পাশ ফাঁকা, সুনশান। হন্ডুরাস মধ্য আমেরিকার সেইসব শহরগুলোর একটা যার ওপর দিয়ে মাঝে মাঝেই আটলান্টিক ঝড়, বৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বয়ে যায়। এবং অন্য শহরের সঙ্গে তাদের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম চলুটেকা ব্রীজ ভেঙে দিয়ে চলে যায়। তখন ওখানকার সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে এবার যে নতুন ব্রীজ হবে, তা তৈরি করবে জাপান (টেকনোলজির জন্য জাপান সারা পৃথিবীর অগ্রগণ্য, আমরা সবাই জানি) এবং এমনভাবে সেই ব্রীজ হবে যে যতই ঝড় বয়ে যাক, সেই ব্রীজকে নড়াতে পারবে না। ঠিক সেইমত ১৯৯৬ সালে নতুন করে চলুটেকা ব্রীজ তৈরি হয়। এবং ১৯৯৮ সালে এক বিধ্বংসী হারিকেন বয়ে যাবার পরেও দেখা যায়, সত্যিই, সেই ব্রীজকে হারিকেন নড়াতে পারে নি। ব্রীজ সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু মুশকিল হয় অন্য জায়গায়। সেই হারিকেন চলুটেকা ব্রীজের দুপাশের রাস্তা পুরো নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আরো বড় ব্যাপার, হারিকেনের প্রভাবে চলুটেকা নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং দেখা যায় চলুটেকা তার আগের গতিপথের পাশ দিয়ে বইছে। ফলে, চলুটেকা ব্রীজ এক ফাঁকা সুনশান ভুতুড়ে ব্রীজে পরিনত হয় যার দু’পাশে কোন রাস্তা নেই, যার নিচে শুধু বালি, আর পাশ দিয়ে নতুন গতিপথে বয়ে চলেছে চলুটেকা নদী। সেই থেকে ঐ ব্রীজের নাম হয় ‘দ্য ব্রীজ ওভার নাথিং, টু নোহয়্যার’।

প্রকাশ আইয়ার খুব বুদ্ধিমান মানুষ। উনি ঐ ছোট্ট লেখায় কোথাও কোভিড প্রসঙ্গ টেনে আনেন নি। বরং আমাদের কেরিয়ারের সঙ্গে ঐ চলুটেকা ব্রীজের তুলনা করে কি করে আমরা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল হতে পারি সেটা বলেই ফুলস্টপ দিয়েছেন। কিন্তু আমি যেহেতু একজন বোকা মানুষ, ঐ লেখা পড়ে আমার মনে এই মুহুর্তে প্রচুর প্রশ্ন আসছে। এবং তার বেশির ভাগটাই কোভিড ও পূজো সংক্রান্ত। তাহলে শুরু করি।

আমাদের দেশে ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি হয়। রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম হয়। একদম আম আর দুধের মত। মাঝখান থেকে সাধারন মানুষ গড়াগড়ি খায়। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট বহু আগে বন্ধ না করে, কোন এক রাজ্য সরকারকে গদিচ্যুত করা অব্ধি অপেক্ষা করে কেন্দ্র সরকার যখন লক-ডাউন ঘোষনা করল, তখন বিষবৃক্ষের বীজ ভারতে ঢুকে ফল-ফুল তৈরি করে ফেলেছে। তারপর করোনার বাহানায় একটানা ৯৮ দিন লক-ডাউন। সাধারন মানুষ সেটা ধৈর্য্য ধরে পালন করল। কেউ জিজ্ঞেস করল না, এই চলুটেকা ব্রীজের এপাড়ে আর ওপাড়ে কি আছে? মহামারী থেকে উদ্ধারের রাস্তা আছে তো? তাদের মাঝে মাঝে বলা হল, কাঁসর ঘন্টা বাজাও। তারা তাই করল। কখনো বলা হল, মোমবাতি জ্বালাও। তারা সেটাও করল। কখনো আবার বলা হল, কোন এক পৌরানিক চরিত্রের (যে কিনা আদৌ ইতিহাস স্বীকৃত নয়) কাল্পনিক বাসস্থানে এসে ইঁট গাঁথো। সেটাও তারা করল। কিন্তু কেউ এবারেও জিজ্ঞেস করল না, স্যার, এই ব্রীজের এপাড়-ওপাড়টা একটু দেখান না প্লিজ। আসলে বেশিরভাগ ভারতবাসী প্রশ্ন করতে শেখে নি। তারা ভাল মন্দ বুঝতে পারে না। সচেতনতা তৈরি হয় নি। তাদের সামনে একটা চলুটেকা ব্রীজ রেখে যদি কোন এক দাড়িওয়ালা মহামহিম বলেন, এটা আজ থেকে পৃথিবীতে প্রভুর ফেলে যাওয়া খড়ম মনে করে পূজো করো, তারা সেটাই করবে। আর যারা প্রশ্ন করতে জানে, তাদের কোন এক ছলছূতোয় কাফিল খান বা ভারভারা রাওয়ের মত জেলে কিছুদিন রেখে দিলেই সে বাবুরাম সাপুড়ের মত ঠান্ডা হয়ে যাবে। ফলে সবার মুখে তালা। এমনকি জটায়ুর মত বোকা প্রশ্নও করা চলবে না – ‘উট কি কাঁটা বেছে খায়?’

যারা প্রফেসনাল কোর্সের মানুষজন, যেমন আমরা, কি করলাম, তার থেকেও বড় কথা, কেন করলাম সেটায় বেশি নজর দিই। যাতে সময়ের সাথে সাথে সমস্যা বদলে গেলে সমাধানটাও যেন সেই প্রেক্ষিতেই উঠে আসে। যাতে আরেকটা চলুটেকা ব্রীজ তৈরি না হয়। তার মুড়ো আর লেজটা যেন অক্ষত থাকে, তার উদ্দেশ্যটা যেন বজায় থাকে। অথচ অদ্ভুত, দেখলাম, ৯৮ দিনের আগাগোড়া এক অবৈজ্ঞানিক লক-ডাউন ভারতে পালন করা হল। ছুরি মেরে মেরে ইকোনমিকে হত্যা করা হল। লক-ডাউন যে ঘরে বসে চুপচাপ যোগাসন করা নয়, বরং এই সময়কে কাজে লাগিয়ে সাংক্রামিতকে আলাদা করে রোগের মূল অব্ধি পৌঁছে যেতে হবে, এবং প্রত্যেক নাগরিককে কিছু স্বাস্থ্যবিধি আবশ্যিকভাবে মেনে চলতে হবে, সেইসব কিছু না বুঝিয়ে প্রত্যেক দল নিজের রংয়ের কর্মসূচি পালন করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। একটাই উদ্দেশ্য – এই মহামারীর মাঝেও ২০২১ এর ভোটে জয়লাভ। ফলে সাধারন মানুষও কোভিড আক্রান্ত হল, রাজনৈতিক লোকেরাও আক্রান্ত হল। আমি সেই মে মাস থেকে সংবাদ প্রভাতীর বিভিন্ন লেখায় বলে আসছি, এভাবে লক-ডাউনের দরকার হয় না, বরং অন্য কিছু মডেল ভাবা যেতে পারে যেভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফল হয়েছে। আমার কথা ছাড়ুন, আমি নাহয় নেংটি, কিন্তু অনেক বাঘা বাঘাও একই কথা বললেন। কারো কথাই শোনা হল না। ফলে এই লক-ডাউন চলুটেকা ব্রীজ হিসেবেই রয়ে গেল। যার কোন আগা-লেজা নেই, কোন উদ্দেশ্য নেই। সকলকে লক-ডাউন প্রকৃত অর্থে মানতে বাধ্য না করায় কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা রকেটের মত বেড়ে গেল, ভারতের অর্ধেক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেল এবং জিডিপি নামতে নামতে মাইনাস দশ শতাংশ হয়ে গেল!

এবার আসুন এই মুহুর্তের হিসেবে। ভারতে কোভিডে আক্রান্ত প্রায় ৭৮ লাখ, মৃত প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার। এই দুয়েই ভারত এখন পৃথিবীতে দ্বিতীয়। এক নম্বরে যেতে বেশি সময় লাগবে না। আর দৈনিক সংক্রমন ও মৃত্যুর হিসেবে পৃথিবীতে বিগত প্রায় দু’মাস ধরে এক নম্বরে। পাশ্চাত্যের দেশগুলো এখন ভয়ে ভয়ে আবার যে কোন ধরনের সমাবেশ বন্ধ করে দিয়েছে, যে কোন সময় কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে সেই আশঙ্কায়। গোষ্ঠী সংক্রমনের আশঙ্কায়। অথচ ভারতে এখন দুর্গাপূজোর প্রস্তুতি ও আয়োজন চলছে। ভাবখানা এমন, যেন দেবী দুর্গা এলেই করোনা ভয়ে ভয়ে দেশান্তরী হবে। অনেক ডাক্তার ও বিদগ্ধজনেরা বারবার বলেছেন, পূজো তো প্রতি বছর আসে। তাহলে এবারের মত না করলে কি এমন ক্ষতি হত? অন্তত এবার গোষ্ঠী সংক্রমন রুখতে হলে পূজো এড়িয়ে যাওয়াই সবথেকে ভাল উপায় ছিল। কিন্তু কেউ কি শুনছে সেই কথা? বরং হাইকোর্টের রায় নিয়ে সমস্ত পূজো উদ্যোক্তারা ক্ষুব্ধ। প্যান্ডেল ‘নো-এন্ট্রি জোন’ হলে, প্যান্ডেলে লোক না এলে স্পনসররা টাকা দেবেন না। ফলে উদ্যোক্তারা ভীড়ের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে কোন কথা বলতে চাইছেন না। কোভিড ও লক-ডাউনের জন্য এত লাখ লাখ লোকের চাকরি চলে গেছে, প্রচুর চাকরিজীবি এখন রাস্তায় ফল বেচছেন বা সব্জি। কেউ দিনমজুর। তাদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়ে গুলো এরপর আর স্কুলের পাহাড় প্রমাণ ফি মিটিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারবে কিনা কেউ জানে না। এইসব ভবিষ্যত নাগরিকদের কথা না ভেবে, চাকরি হারানো মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর কথা না ভেবে, কোভিডের গোষ্ঠী সংক্রমন ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা না ভেবে, কাদের স্বার্থে এই অসময়ে এত খরচ করে পূজো হচ্ছে? এর উত্তর পূজো উদ্যোক্তা বা সরকার, কেউ কখনো ভেবে দেখেছেন কি?

কলকাতার বড় বড় প্যান্ডেল গুলো টিভিতে দেখছি আর বারবার চলুটেকা ব্রীজের কথা মনে পড়ছে। এই অতিমারীর মধ্যেও এ বছর কোন্‌ মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এইরকম শ্রম ও খরচাসাপেক্ষ পূজো করা হল, এবং তাও এই আনলক ফেজের ভেতরেই, কেউ কি সদুত্তর দিতে পারবেন? এর আগের আর পরের রাস্তাটা, অর্থাৎ দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের সাপেক্ষে ইকোনমির কিভাবে কতটা লাভ হল আর ভীড়ের মধ্যে ভাইরাস কিভাবে রুখে দেওয়া গেল, তার ব্লু প্রিন্ট আছে তো? এইরকম উৎসব করে মানুষকে একত্রিতভাবে ডেকে আনা মানে তো গোষ্ঠীসংক্রমনের মাধ্যমে ধ্বংসকে আহ্বান করা। ধ্বংসের উৎসব পালন করা, তাই নয় কি?

আমরা তো মৃত জনের উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালাই। এবার যদি প্রতি পূজো কমিটি ঠিক করত যে কোভিডে মৃতদের উদ্দেশ্যে তাদের পূজোপ্রাঙ্গনে মোমবাতি জ্বালান থাকবে, শুধুমাত্র ঘটপূজো হবে, পাশাপাশি পূজোর সঙ্গে যারা প্রতি বছর জুড়ে থাকে, সেই পুরোহিত, কুমোরটুলি, ঢাকি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্যান্ডেলওয়ালা, ঝাড়ুদার, জনমজুর, এদের সবাইকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা হবে, আর প্রতি পূজোর এলাকায় যদি কারো চাকরি চলে গিয়ে থাকে তাহলে তার ছেলেমেয়েরা যাতে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা হবে, তাহলেই হয়ত সঠিক অর্থে পূজো হত। এইসব বিশাল বিশাল উদ্দেশ্যহীন প্যান্ডেলগুলো চলুটেকা ব্রীজের মত আমাদের আর্থিক রুগ্ন সমাজে ‘দ্য সেলেব্রেশন ওভার নাথিং, টু নোহয়্যার’ পরিহাস ছুঁড়ে দিত না।  


লেখক : প্রিন্সিপ্যাল, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।


Post a Comment

0 Comments