চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

হাওড়া-নিউ জলপাইগুড়ি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের যাত্রার সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী # ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়, ফ্রান্স কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ান মেসি # জয়েন্ট এন্ট্রান্স (মেইন) এর প্রথমভাগের পরীক্ষা ২৪ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত # বর্ধমান জেলা রাইস মিলস অ্যাসোসিয়েশন এর শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন # বাংলার চিকিৎসক উজ্জ্বল পোদ্দার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরার তালিকায় #সরকারি কর্মচারীদের সুখের দিন শেষ, শ্রম কোড চালু হতে চলেছে সমগ্র ভারতে # পশ্চিমবঙ্গে কোভিড বিধিনিষেধ প্রত্যাহার # #পূর্ব বর্ধমান জেলায় মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এর উদ্যোগে খালবিল ও চুনোমাছ উৎসবের উদ্বোধন ২৫ ডিসেম্বর

সাঁওতাল বিদ্রোহ ( চতুর্থ কিস্তি)



সাঁওতাল বিদ্রোহ (চতুর্থ কিস্তি)


 🔸 শিবানন্দ পাল


 ➡️ বাংলা,  বিহার,  উড়িষ্যা  তখন  একটি  প্রদেশ, ভাগলপুর একটি ডিভিশন।মিঃ অলিভার ব্রাউন ডিভিশনের কমিশনার, তাঁর  অবসরের  সময় হয়ে এসেছিল। তাঁরই অধীনে কাজ করতেন দামিনকো-র সুপারিনটেনডেন্ট  মিঃ জেমস পনেট বা পন্টেট। মিঃ পনেটকে ব্রাউনের সুপারিশে ১৮৫৪ সালের ৩ নভেম্বর মুন্সেফ পদে নিযুক্ত করা হয়।কিন্তু পনেট এই পদে যোগদান করেন ২০ মার্চ, ১৮৫৫। পনেট একই জায়গায় কাজ করছেন অথচ প্রায় পাঁচ মাস পরে মুন্সেফ পদে কেন যোগদান করেন জানা যায় না। কারণ কমিশনার ব্রাউন চেয়েছিলেন পনেট তাড়াতাড়ি কাজে যোগ  দিন।  পনেট দামিনকোর  দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক হিসেবে ১৮৩৭ থেকে সেখানে কাজ করছেন।  মুন্সেফ ক্ষমতা  তাঁকে অধিকতর ক্ষমতাশালী  করবে অপরদিকে মহাজনদের  বাড়িতে ডাকাতির সংখ্যা  বেড়ে যাচ্ছে। মিঃ ব্রাউন বুঝতে পারছিলেন সাঁওতালদের ক্ষোভ বাড়ছে।
 জেমস পনেট বা পন্টেট-র কাজ ছিল সাঁওতালদের কাছ থেকে  রাজস্ব আদায় করা। আর এই  কাজে তাঁকে সাহায্য করতেন দিঘি থানার দারোগা মহেশলাল দত্ত। দারোগা মহেশলাল দত্তর খুব একটা সুখ্যাতি ছিল বলে জানা যায় না। কুখ্যাত বলেই পরিচিত ছিলেন।তিনিই সাঁওতাল বিদ্রোহের মূল অনুঘটক। আর পনেট  সাহেবকে  সাঁওতালরা বলতো পাল্টিন  সাহেব। কেন বলতেন?  তিনি  কী মাঝে  মাঝে পাল্টি খেতে  অভ্যস্ত ছিলেন!  তাঁর লেখা  নথিগুলোতে যে মনোভাব ফুটে ওঠে তা তাঁর কাজের সাথে মেলে না। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাওড়া-রানীগঞ্জ রেলপথ চালু হয় ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৫৫। ফলে রানীগঞ্জ থেকে সিউরি হয়ে স্থলপথে দুমকা, লিটিপাড়া,  পাকুড় বা বারহেট রাজমহল যোগাযোগ দ্রুত ও সহজ হয়ে যায়। তাহলে কী কোম্পানি সরকারের ওপর মহলে সাঁওতালদের বিরুদ্ধে কোনও চক্রান্ত হয়েছিল? সেজন্য‌ই ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করা? সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। ১৮৫৫-র সাঁওতাল বিদ্রোহের ৭০ বছর আগে এই দামিন-ই-কোহ’তেই সাঁওতালরা প্রথম ইংরেজদের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠেছিল।

পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা ও বিহারের ক্ষমতা দখল করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোম্পানির কর্মচারীদের একটা বড়ো অংশ ছিল অর্থলোভী। বাংলা ও বিহার দুই প্রদেশের ধন সম্পদ অবাধে লুঠ করতে থাকলেও তারা বাংলা বিহারের অরণ্য অঞ্চলে খুব একটা ঘেঁষত না। বিহার ও বাংলার অরণ্য অঞ্চল ছিল রাজমহল থেকে শুরু করে পশ্চিমে ভাগলপুর, মুঙ্গের হয়ে হাজারিবাগের সীমানা পর্যন্ত। পুবে বীরভুম, বর্ধমান; দক্ষিণে বাঁকুড়া মেদিনীপুর হয়ে উড়িষ্যার ময়ুরভঞ্জ এলাকা পর্যন্ত। এই অরণ্য ছিল ছোট ছোট পাহাড় ও শ্বাপদ-সঙ্কুল গভীর জঙ্গলে ভরা। জঙ্গলে শাল,  শিমূল,  পলাশ,  আম, জাম, কাঁঠাল, মহুয়া প্রভৃতির গাছ ছিল। ছিল কাঁটা গাছের ভয়ঙ্কর ঝোপ। দুর্ভেদ্য এই জঙ্গল ছিল বাঘ, ভালুক, হাতি প্রভৃতি বন্য জন্তুর আবাসস্থল। পাঠান ও মোগল সৈন্যরাও বাংলায় আক্রমণ হানতে এই পথে যাওয়া আসা করলেও এই বিশাল জঙ্গল পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী পাহাড়িয়া মানুষদের খুব একটা ঘাঁটাত না। পাহাড়িয়ারা তাঁদের শিকার ও আদিম প্রথায় চাষ-আবাদ নিয়েই সুখে ছিল। কোনোদিন তারা কারো বশ্যতায় থাকেনি। নিজেদের সামাজিক কৌম্য বন্ধনে সুখী ছিল। একদা কোনও এক সময়ে গুপ্ত যুগ এবং তার পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে আঞ্চলিক ছোট ছোট রাজ্য ছিল। আঞ্চলিক স্থানীয় রাজারা শাসন করতেন। রাজমহল এক সময় বাংলার রাজধানী ছিল বলে উল্লেখযোগ্য নয়। ঐতিহাসিক কারণে রাজমহল গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে কনৌজ রাজ হর্ষবর্ধন, কামরূপ রাজ ভাস্করবর্মা বিখ্যাত চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙ একত্রে মিলিত হয়েছিলেন। সে অন্য গল্প।

নবাবি আমলে হিন্দু মুসলমান জমিদারেরা রাজমহল পাহাড়ের আশেপাশে কিছু কিছু জমি দখল করেছিল, কিন্তু অরণ্যভূমিতে তারাও প্রবেশ করেনি।স্বাধীনচেতা অরণ্যভূমির সন্তানরা কাউকে তাদের এলাকায় প্রবেশ করতে দিত না। জমিদাররা লোকজন নিয়ে অরণ্যে প্রবেশের চেষ্টা করলে তারা আরও গভীর জঙ্গলে সরে যেত, নয়ত বনের ভিতর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুড়ে আক্রমণ করত। জমিদারের লোকজনদের সাধ্য ছিল না সেই আক্রমণ প্রতিরোধ করে। এজন্য প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় আদিবাসী সর্দারদের নেমন্তন্ন করে পাগড়ি, পোশাক, ও নানা জিনিস উপহার দেওয়ার একটা সামাজিক নিয়ম চালু হয়েছিল। এই ব্যবস্থা এখনও সাঁওতাল পরগণার আশেপাশে অনেক জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়।

দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার প্রথম দিকেই সাঁওতালরা নানা রঙের পোষাকে সজ্জিত হয়ে নাচতে নাচতে অনেক শহরেই সিধে নিতে আসে। বর্ধমান শহরেও এরকম একটি পরম্পরা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজমহল এলাকার দেওয়ানি নেওয়ার পরই আদিবাসীদের দমন করার কর্মসূচি নেয়। বিশেষভাবে সাঁওতাল পরগণার পাহাড়িয়াদের। তাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় আঘাত করে।

দামিনকো অঞ্চল তখনও সাঁওতাল পরগণা নাম হয়নি। সাঁওতালদের তুলনায় পাহাড়িয়ারা ছিল বুনো এবং হিংস্র প্রকৃতির। সাধারণত সাঁওতালদের বাস পাহাড়ের নীচে সমতলে, পাহাড়িয়াদের বাস পাহাড়ের ওপরে। সাঁওতালদের তুলনায় এদের গায়ের রঙ কম কালো। উচ্চতা কম অর্থাৎ বাঁটুল বাঁটুল চেহারা। দেখলেই বোঝা যায় শরীরে অসম্ভব ক্ষমতা ধরে। পাহাড়ের ওপরে ছোট ছোট ঝুপড়িতে তাদের বাস। শীতের আগে তারা নীচে নেমে আসত, সমতলের ফসল লুঠ করত। কেউ বাধা দিলে মারমূর্তিতে তাকে ধ্বংস করত। কোম্পানি আমলের রাজস্ব আদায়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী শেরউইল এদের ‘পর্বত অরণ্যচারী’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি তাঁর রিপোর্টে লিখেছেন, “পাশাপাশি জেলাগুলির কাছে এই পাহাড়িয়ারা ছিল মূর্তিমান বিভীষিকা ; এই জেলাগুলির অধিবাসীদের কাছ থেকে তারা জোর করে অর্থ আদায় করত। যখন অর্থ পেত না তখনই তারা সশস্ত্র দলে সংঘটিত হত এবং বাঁশের তীর-ধনুক নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসত। যে কেউ তাদের ডাকাতিতে বাধা দিত তাকেই তারা হত্যা করত এবং কাছাকাছি ও দূরে লুটতরাজ করে দুর্ভেদ্য জঙ্গলের নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেত।“ (ক্যাপ্টেন শেরউইল’স রিপোর্ট, পৃষ্ঠা ২৬)।

১৭৭২ সালে ক্যাপ্টেন ব্রক একদল সিপাহী নিয়ে পাহাড়িয়াদের দমন করতে গেছিলেন। পাহাড়িয়ারা অধিকাংশ সিপাহীকে জঙ্গলের আড়াল থেকে তীর ছুঁড়ে হত্যা করেছিল। ব্রককে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। পরের বছর অগসটাস ক্লিভল্যান্ড রাজমহলের সুপারিন্টেনডেন্ট হয়ে আসেন। ১৭৭৯ সালে তিনি ভাগলপুরের কালেক্টর পদে নিযুক্ত হন। পাহাড়িয়াদের তিনি বোঝাতে সফল হলেন যে তাদের অভাব অভিযোগ দূর করার দায়িত্ব তিনি নেবেন। সর্দারদের জন্য মাসিক দশ টাকা, আর মাঝিদের জন্যে দু’টাকা বেতন ও তাদের জন্যে নীল জামা, লাল পাগড়ির ব্যবস্থা করলেন। এছাড়াও বহু পাহাড়িয়া যুবককে তিনি সিপাহীতে নিয়োগ করলেন।

কুমার চৈতন্য হেব্রাম-এর লেখা থেকে জানা যায় ১৭৮০ সালে এরকম চারশো পাহাড়িয়াকে সিপাহীতে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তারা সর্দারদের অধীনে কাজ করত। মূলত কোম্পানি সরকার অরণ্য প্রদেশে এদের দিয়েই শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করতে চেয়েছিল। পরীক্ষিত হওয়ার পর ভাগলপুরে এদের কোনও একজন লেফটেন্যান্ট বা ক্যাপ্টেনের অধীনে বহাল করা হতো। (সানতাল পরগণা, সান্থাল আর পাহারিয়া কোওইয়াঃক ইতিহাস-- চৈতন্য হেব্রাম কুমার, পৃষ্ঠা ৩১)।

বন্ধুদের স্মরণে রাখতে বলি, সাঁওতালদের তুলনায় পাহাড়িয়ারা এখনও পশ্চাৎপদ শ্রেণি। অথচ জানা যাচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদলে এদের নেওয়া হয়েছিল।

মাছের তেলে মাছ ভাজা কৌশলে ক্লিভল্যান্ড অল্প দিনের মধ্যেই পাহাড়িয়াদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পাহাড়িয়ারা তাঁকে
 ‘চিলিমিলি সাহেব’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। ক্লিভল্যান্ড বছরে দু’বার  পাহাড়িয়া সর্দার এবং মাঝিদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। তিনি নিজেই সেই বৈঠক পরিচালনা করতেন। এই ক্লিভল্যান্ড-এর পরামর্শে কোম্পানি সরকার পাহাড়িয়াদের জন্যে বিশেষ অঞ্চল  ‘দামিন-ই-কোহ’-র পরিসীমা নির্ধারণ এবং পরিকল্পনা করে।কিন্তু পাহাড়িয়ারা শেষ পর্যন্ত তাঁর বশে থাকে না।

একই প্রতিক্রিয়া সাঁওতালদের। তারা অরণ্যভূমির সন্তান। অরণ্যে স্বাধীনভাবে এতদিন জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে। মোগলযুগেও কেউ তাদের ঘাঁটায় নি। তাঁদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়নি। কোম্পানির লোকজন তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়। জমির ওপরে খাজনা দেওয়াকে তারা ঘোরতর অন্যায় মনে করল। শুরু হল তাদের ওপরে ইংরাজ শাসকের অত্যাচার-উৎপীড়ন। কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাদের জীবন অসহনীয় করে তোলে। তাদেরকে ধরে নিয়ে এসে ভাগলপুরের জেলে পোরা হতে থাকে। এই রকম একটা সময় বিদেশী শাসকের বর্বরসুলভ এই মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামনে এসে দাঁড়ান বাবা তিলকা মাঝি। তাঁর আসল নাম তিলকা মুরমু। এখনও কেউ কেউ বলেন তিনি সাঁওতাল পরগণার পাকুড় অঞ্চলের লিটিপাড়া সংলগ্ন এলাকার মানুষ ছিলেন। তাঁর চোখ খুব বড়ো বড়ো ছিল বলে শৈশবে নাম রাখা হয় তিলকা। তিলকা ছিলেন অসীম সাহসী আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। সাঁওতালদের নিয়ে তিনি নিজের একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। বাহিনীর সবাইকে তীর-ধনুক, টাঙ্গি-বল্লম ও বাঁটুল চালনা শিক্ষা দিতে লাগলেন। নিজেও ছিলেন তীর ও বাঁটুল চালনায় পারদর্শী।

গ্রামে গ্রামে সাঁওতাল যুবকরা তাঁর দলে ভিড়তে থাকে। অবশেষে একদিন তিনি প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। তাঁর মুক্তি বাহিনী অরণ্যে হঠাৎ বের হয়ে এসে ইংরেজ সৈন্যদের আক্রমণ চালিয়ে আবার অরণ্যে উধাও হয়ে যেত। এইভাবে ইংরেজ সৈন্যদের তারা অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। অবস্থা এমনি হয় যে ইংরাজ সৈন্যরা জঙ্গলের ধার দিয়ে ঘেঁষত না। শত শত সাঁওতাল বিদ্রোহী যেমন ইংরেজদের বন্দুকের গুলিতে প্রাণ দেয়, তেমনি ইংরেজরাও বাঁটুলের গুলি এবং তীরের আঘাতে প্রচণ্ড মার খায়। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই জানুয়ারি, অন্য মতে ১৭৮৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ক্লিভল্যান্ড সাহেব তিলকার বাঁটুলের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হয়ে প্রাণ হারান।

ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যুতে ইংরেজ শাসক একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে এসে সাঁওতাল গ্রামগুলো তারা চষে ফেলতে থাকে। প্রায় একবছর ধরে চলে নির্মম পাশবিক অত্যাচার, তারপর তিলকা ও তাঁর অনুচরদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী।

তিলকাকে ভাগলপুরে ধরে এনে নিদারুণ চাবুক মারা হয়। তারপর ঘোড়ার পিছনে বেঁধে টানতে টানতে গোটা শহর ঘোরানো হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। তিলকা মাঝিকে যেখানে ফাঁসি দেওয়া হয় ভাগলপুর শহরের সেই জায়গায় (তিলকা চক) তিলকা মাঝির মর্মর মূর্তি এখন শোভা পায়।

ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যুর পর দামিন-ই-কোহ’র ভার দেওয়া হয় আবদুল রসুল খাঁ নামে এক দেশীয় কর্মচারীর উপর। বেছে বেছে এই আবদুল রসুল খাঁকে এই দায়িত্ব কেন দেওয়া হল? ইনি কোথা থেকে এলেন বা কোনো হিন্দু জমিদার বা মহাজনকে কেন দেওয়া হয়নি, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। এই রসুল খাঁ সম্পর্কে কেউ আলোকপাত করতে চাইলে জানতে আগ্রহী।


পাহাড়িয়াদের যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল রসুল খাঁ-র সময়ে সে সব বন্ধ হয়ে গেল। অসন্তোষ আরও বেড়ে গেল। ১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ তিন বছর ধরে ইংরেজ শাসন এই অঞ্চলে অচল হয়ে পড়েছিল, কিন্তু সেরকম কোনো বিশদ তথ্য নেই। ইংরেজদের মার খাওয়ার তথ্য কী আর তারা সাজিয়ে তুলে রেখে দেবে? উইলিয়াম হান্টার এই সময়কে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের কথা বলে উল্লেখ করে কিছু কথা লিখেছেন তাঁর ‘দি এনালস অফ রুরাল বেঙ্গল’ গ্রন্থে। পাহাড়িয়াদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল সমতলের কৃষকরাও। (দি এনালস অফ রুরাল বেঙ্গল- ডবলু ডবলু হান্টার, পৃষ্ঠা ৭৪)।

হান্টার সাহেব নিজে স্কটিশ, ১৮৬২-তে ভারতে এসেছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসক হিসেবে। তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভারতের গেজেটিয়ার তৈরি করা। তাঁর উদ্যোগে ১৮৬৯ সাল থেকে গেজেটিয়ার প্রকাশ শুরু হয়। ১৮৮১ সাল অবধি নয় খন্ড প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর আরো ২৬ খণ্ড প্রকাশিত হয়। তবে লেখক হিসেবে তার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব‌ই হল দ্য ইন্ডিয়ান মুসলিম। ভারতের মুসলমানদের বুঝতে হলে ব‌ইটি পড়তেই হবে।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে এখনো আমাদের তাঁর কাজের ওপর নির্ভর করতেই হয়।

১৭৮৮ সালের মাঝামাঝি থেকে ওই সময়ের সাঁওতাল বিদ্রোহীরা দামিনকো এলাকা পশ্চিম অংশে সংঘবদ্ধ হামলা চালাতে শুরু করে। ইংরেজ বণিকদের কুঠি এবং জমিদারদের কাছারি লুট হতে থাকে। বীরভূমের কালেক্টর ক্রিস্টোফার কিটিং সেনাবাহিনী নিয়োগ করেন। কিন্তু তাতে কোনও ফল হয় না। বীরভূমের কালেক্টরের ১৭৮৯ সালের ১০ জানুয়ারি লেফটেন্যান্ট স্মিথকে লেখা একটি চিঠি থেকে জানা যায় বীরভূম জেলার ত্রিশ চল্লিশটি গ্রামের জমিদারদের শস্য গোলা এবং ইংরাজ বণিকদের কুঠি লুট হয়েছিল। এই সমস্ত এলাকা থেকে ইংরেজ শাসন একেবারে মুছে গিয়েছিল। বিদ্রোহের চেহারা দেখে ইংরেজরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হান্টার সাহেব লিখেছেন, বিদ্রোহীরা তিন থেকে চারশত লোকের এক একটি দলে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে আক্রমণ চালায়। মিঃ কিটিং নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে অনিয়মিত সৈন্যদের নিযুক্ত করেন ১৭৮৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তবু কোনও  সুরাহা হয় না।

বীরভূমের কালেক্টর ১৬ অক্টোবর,  ১৭৮৯ গভর্নর জেনারেলকে এক চিঠিতে জানিয়েছেন, “আমাদের এখানে যে সৈন্যদল আছে তা দিয়ে বিদ্রোহীদের বাধা দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সৈন্যদের তুলনায় বিদ্রোহীরা অনেক বেশী শক্তিশালী, অনেক বেশী সুশৃঙ্খল ও অনেক বেশী সাহসী। আর আমাদের সৈন্যরা শৃঙ্খলাহীন,  উদ্যমহীন এবং তারা লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে সহযোগিতাই বেশী পছন্দ করে।“ (দি এনালস ওফ রুরাল বেঙ্গল- ডবলু ডবলু হান্টার, পৃষ্ঠা ৭৭)।

স্পষ্ট বোঝা যায় দেশীয় সৈন্যরা সেসময় পাহাড়িয়াদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। যার ফলে পাহাড়িয়াদের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তাঁদের রণ-কৌশল উন্নত হয়েছিল,  বিদ্রোহীদের সংখ্যাও বেড়েছিল। পাশাপাশি ইংরেজ শাসকের নৃশংসতাও বেড়েছিল। ‘ইংরেজ সৈন্যরা বিদ্রোহীদের বন্দি করা মাত্র হত্যা করে তাদের ছিন্ন মুণ্ডুগুলো ঝুড়ি বোঝাই করে সদর দপ্তরে পাঠাত। (সানথাল পরগণা ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ার- এল এস এস ও’মালী, পৃষ্ঠা ২৯)।  (চলবে)


ছবি : ভাগলপুর শহরের তিলকা মাঝি চকে প্রতিষ্ঠিত তিলকা মাঝির মূর্তি। যেখানে তিলকা মাঝির আধমরা দেহকে ব্রিটিশ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছিল ১৭৮৪ সালে।

যে ব‌ইগুলির সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
১। সাঁওতাল বিদ্রোহের রোজনামচা- তারাপদ রায়, দে’জ পাবলিশিং, কোলকাতা, ২০০৬।
২। সান্থাল পরগণা, সান্থাল আর পাহারিয়াকোওইয়াঃক ইতিহাস-- চৈতন্য হেব্রাম কুমার। ৩। দি এনালস অফ রুরাল বেঙ্গল- ডবলু ডবলু হান্টার। ৪। সানথাল পরগণা ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ার- এল এস এস ও’মালী। ৫। গণ অসন্তোষ ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ- স্বপন বসু, পুস্তক বিপণি, কলকাতা, ১৯৮৪। ৬। দি সান্থাল ইন্সারেক্সান অফ ১৮৫৫-৫৭---কে কে দত্ত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ৭। সাঁওতাল গণ-সংগ্রামের ইতিহাস-ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে, পার্ল পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৮০। ৮। গণ অসন্তোষ ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ- স্বপন বসু, পুস্তক বিপণি, কলকাতা, ১৯৮৪।


                  পরবর্তী অংশ আগামী মঙ্গলবার

Post a Comment

0 Comments