Scrooling

নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রীসভায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে শপথ নিলেন ডঃ সুকান্ত মজুমদার ও শান্তনু ঠাকুর # অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভুগছেন ? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ অয়ন শিকদার আগামী ২১ জুলাই বর্ধমানে আসছেন। নাম লেখাতে যোগাযোগ 9734548484 অথবা 9434360442 # আঠারো তম লোকসভা ভোটের ফলাফল : মোট আসন ৫৪৩টি। NDA - 292, INDIA - 234, Others : 17 # পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফলাফল : তৃণমূল কংগ্রেস - ২৯, বিজেপি - ১২, কংগ্রেস - ১

পূর্ণগ্রাস



   পূর্ণগ্রাস 

 🔸 শিবানন্দ পাল

 ➡️ এবারের সূর্য গ্রহণ নিয়ে তেমন হৈচৈয়ের সুযোগ ছিল না। লকডাউনে আমাদের মনের চারপাশে ঘেরাটোপ পড়েছিল। সবাই নিজের নিজের জগতে বন্দি করে নিয়েছে নিজেদের। টিভি আসার প‍র সামাজিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। তবু মানসিক দূরত্ব টিকে ছিল। এখন করোনা এসে ষোলকলা পূর্ণ করছে। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং নামে নিজ নিজ ঘেরাটোপে আমরা কিছুটা আন-সোশ্যাল হয়ে পড়ছি। অন্তত আমার নিজেকে সে রকমই মনে হয়।

সে যাক্। যে গল্পটা আজ বলতে চাই। পূর্ণ গ্রাস গ্রহণ দেখার গল্প। গ্রহণ তো অনেক রকমের হয়। বলয় গ্রাস, খণ্ড গ্রাস, রাহু-কেতু'র গল্প আছে। সে সব গল্পের কোনোটায় ভর করে যদি বলি এখন আমাদের দেশে গ্রহণের দশা চলছে, তাহলে অনেকেই হয়তো আমার ওপর কুপিত হবেন। বারবার বেলাইন হয়ে যাচ্ছি। এই হচ্ছে আমার বদাভ্যাস। আমার অনেকগুলো রোগের একটি।

১৯৯৫-এ পুজোর ছুটির সময়। তারিখ দেখলাম ২৪ অক্টোবর। তা আগেও একটা ভালো সুযোগ এসেছিল ১৯৮৬ সালে। সেবার মানুষের উৎসাহ ছিল কম। ১৯৯৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশে বিশাল অঞ্চল জুড়ে পূর্ণ গ্রাস সূর্য গ্রহণ দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। চাঁদের মূল ছায়া পুরুলিয়ার ওপর ঘেঁষে যাবে বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে বের করেছিলেন। বর্ধমানের ওপর দিয়ে যাবে তবে সেটা মূল ছায়া নয়, আংশিক কম। সেজন্য পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়, মেদিনীপুরের দীঘা, চব্বিশ পরগণার কিছু জায়গা চিহ্নিত হয়েছিল, গ্রহণ দেখার ভালো স্পট হিসেবে।

সেবার বিজ্ঞান মঞ্চের ব্যবস্থাপনায় পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে ছাত্রছাত্রী সমেত অনেককে বাসে করে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখাবার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বর্ধমান থেকে। তাছাড়া বিজ্ঞান চশমা বিলি , কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। ওদের সাথে পুরুলিয়া যাব, কি যাব না ... এসব দোনামোনায় আগে থেকে কিছু পরিকল্পনা করা হয়নি। তার উপর পুজোর সময় বাড়িতে আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপার ছিল।

গ্রহণের আগের দিন হঠাৎ ঠিক করলাম, জানা গেল ওদের যাত্রী সব বোঝাই হয়ে গিয়েছে। নৌকায় আর জায়গা নেই। শতাব্দীর সেরা প্রাকৃতিক এই দৃশ্য দেখতেই হবে। কে একজন লিখেছেন দরকার হলে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে যেতে আমি প্রস্তুত, যদি বিরল এই ঘটনা চাক্ষুস করার সুযোগ পাই। ছিয়াশি-র ঘটনা ছিল অবহেলিত, সেজন্য ভালো করে দেখবার ইচ্ছেই হয়নি। কাক, কোকিল ডাকাডাকি করেছিল। অন্ধকার রাতের আকাশে তারা ফুটেছিল। ব্যাস এটুকুই। ঘরে ছিলাম। কোনটা কি দশা ওসব আকর্ষণ ছিল না।

১৯৯৫-এ সাজোসাজো ব্যাপার। উইকেণ্ডে বেড়াতে যাওয়ার মতো। তিন চারখানা বাস বুকিং হয়েছে জানতে পারলাম বিজ্ঞান মঞ্চে। ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! সমবয়সী বন্ধুরা পুজো কোম্পানিতে কম্পানি দিতে ব্যস্ত। কেউ রাজি হল না। বন্ধুসম দার্শনিক পথনির্দেশক শিক্ষক সঙ্কটতারণবাবুকে (সঙ্কটতারণ মণ্ডল) একবার স্মরণ করলাম। তিনি আমার সৃষ্টিছাড়া বাই-বায়ানাক্কা ইত্যাদি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ অবগত ছিলেন। আমাকে বরাবর প্রশ্রয় দিতেন। সহযাত্রী হতেন, অথবা আমি তাঁর সহযাত্রী হয়েছি অনেক ক্ষেত্রে। নজির হোসেন, বাদশা মিঞা, আসাদুল আমাদের একটা খ্যাপাটে দল ছিল। সঙ্কটবাবু বাবার বন্ধুস্থানীয় হলেও আমার সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

এককথায় রাজি হলেন। দুপুরে কথা হল। রাত্রি আটটার ট্রেনে আসানসোল যাব। সেখান থেকে রাতের কোনো ট্রেনে গ্রহণ শুরু হবার আগেই পুরুলিয়া পৌঁছে যাব।

যা থাকে কপালে, ছেঁড়া কাঁথা বগলে, দুগ্গা দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়লাম। হাওড়া আসানসোল এক্সপ্রেস মানে চলতি কথায় 'বিধান' ধরে আসানসোল চলে এলাম দুজনে। রাত বারোটা নাগাদ টাটা-পাটনা সুপার এক্সপ্রেস একটা আছে। সেটাতে গিয়ে সময়মতো পুরুলিয়া পৌঁছে যাব ... টেনশনের কোনো গপ্পো নেই।

আসানসোল স্টেশনের বুকস্টলে ব‌ইয়ের পাতা উল্টে, ছবি দেখে দিব্যি সময় কেটে গেল ঘন্টা খানেক। এখানকার ব‌ইয়ের স্টল বেশ বড়, আর সাজানো। টাটা-পাটনা সুপার এক্সপ্রেস শুধু রাইট টাইমেই এলো না, আমরা দুজনেই বসার জায়গা পেয়ে গেলাম।

পুরুলিয়া স্টেশনে নামলাম তখন ভোর। অন্ধকার অন্ধকার কুয়াশা কুয়াশা কুহেলী সকাল। দুজনে স্টেশনের বাইরে এসে জানতে চাইলাম, অযোধ্যা পাহাড় যাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে! দু চারজন দেহাতি মানুষের সাথে কথা বলে, টেনশনে পড়ে গেলাম। স্টেশন থেকে আমাদের যেতে হবে পুরুলিয়া শহরে বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে বাস ছাড়ে। কিন্তু ...

কিন্তুটা বড় প্রবলেম হয়ে সামনে হাজির হল। টেনশনের মধ্যে টেনিশনের কবিতাগুলো ঘুলিয়ে দিল। কিন্তু কী ? না গ্রহণের জন্য এত সকালে কী বাস ছাড়বে ? মরেছে!

আচ্ছা বাসস্ট্যান্ডে তো যাই আগে! তারপরের কথা পরে ভাবা যাবে! পুরুলিয়া স্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ড কম পথ নয়। এটুকু না হয় দুজনে প্রাতঃভ্রমণ করে মেরে দিলাম। অযোধ্যা পাহাড় ... সেই কিন্তু এসে আবার সামনে দাঁড়ায়।

স্টেশনের বাইরে একটা ঘুপচি গুমটিতে কাঠ জ্বেলে একজন চা দোকানি দেখলাম চা তৈরির আয়োজন করছে।

চা হবে! দুজনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চা দোকানি বললেন, গাড়ি তো পাবেন নি। স্ট্যান্ডের সবাই রিজাভ গ্যেছে বটে। দু একট থ্যাকে যদি দ্যেইখে লেবেন! তবে আশট্ কম! জারি যাবার তারা চ‌ইলে গ্যাছে। আম্মুও দোকানঠ্ বন্ধ করি দিব্যেক। হেই বেলাতেই খুইলবেক!

চা তো খাওয়া হোক! তারপর দেখি বিধি বাম না ডান! ধোঁয়ার উনুনে চা তৈরি হল। একটা সাইকেল রিকশা দেখি প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে স্টেশনের দিকে আসছে। আমাদের সামনে উপস্থিত হতেই জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের নিয়ে যাবে?
কুত্থায় বটেক!
সঙ্কটতারণবাবু এবার হাল ধরলেন। বললেন, ধরো যদি অযোধ্যা পাহাড় যেতে চাই!
রিকশাওয়ালা শুধু নয়, চা দোকানিও হেসে গড়িয়ে গেলেন। হেঁই ঠ্যাঁয়ে! অযোধ্যা পাহাড়!
চা দোকানি বুদ্ধি দিলেন, আপনারা আগে স্ট্যান্ডে যান। সেখানে খোঁজখবর করুন। হয়তো আরো প্যাসেঞ্জার থাকবে শেয়ার ট্যাস্কিতে চ‌ইলে জাবেন!
বুদ্ধিটা মন্দ নয়! হেডে মাথা আছে। রিকশাওয়ালাকে বললাম, তাহলে তুমি আমাদের বাসস্ট্যান্ডেই পৌঁছে দাও!

আমাদের রিকশায় চাপিয়ে রিকশাওয়ালা প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ দিলেন। চা খেয়ে ভারী চেহারার সঙ্কটতারণবাবুর গল্প শুরু হলো রিকশাওয়ালার সাথে। থাকো কোথায়? নিজের বাড়ি না ভাড়া বাড়ি। বাড়িতে কে কে আছে? কি রকম রোজগার হয়, কেমন চলে ইত্যাদি ইত্যাদি।

মোদ্দা কথা বাসস্ট্যান্ডে এসে জানা গেল, গ্রহণ না ছাড়া পর্যন্ত কোনো বাস ছাড়বে না। গাড়িও পাওয়া যাবে না। চায়ের দোকান কেন হোটেল, মিষ্টির দোকান কিছুই খুলবে না। আমাদের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা হবে ... তবে তা পুরুলিয়া শহরের মধ্যে থেকে।

শিক্ষক শিক্ষক চেহারা! একজন প্রাতঃভ্রমণকারীর দেখা পাওয়া গেল। তাঁর সঙ্গে যেচে আলাপ করা হলো। আমরা বর্ধমান থেকে এসেছি, সূর্যগ্রহণ দেখতে। অযোধ্যা পাহাড় যেতে চাই, তা এখানে এসে শুনছি বাস পাওয়া যাবে না!

ভদ্রলোক প্রকৃত‌ই শিক্ষকতা করেন। বললেন, না। অযোধ্যা পাহাড়ে আপনাদের যাওয়ার কোনো উপায় নেই। যে সব গাড়ি যাবার তারা কাল সন্ধ্যা থেকেই রাতের মধ্যে রিজার্ভ চলে গেছে। বাসস্ট্যান্ডের গাড়ি সব বেলায় ছাড়বে। আপনারা এক কাজ করতে পারেন, সামনে পুরুলিয়া সায়েন্স সেন্টারে সূর্যগ্রহণ দেখতে পারেন! সেখানেও নানা রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমি তো ওখানেই যাচ্ছি!

ঝট করে উনি আমাদের মুশকিল আসান হয়ে গেলেন। সূর্যের গ্রহণ দেখতে এসে আমরা আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেলাম। বিশাল সাহেব বাঁধের ধারে সুন্দর পুরুলিয়া সায়েন্স সেন্টার। পৌঁছে দেখি প্রায় একশো জন ছাত্রী স্কুলের ড্রেস পড়ে রেডি, নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করবার জন্য। সূর্যগ্রহণের সময় জলের নীচে উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া, গাছেদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া, বাঁদর, হনুমান, অজগর সাপের মধ্যে প্রতিক্রিয়া ... কেমন হবে! এসব তারা দেখবে এবং আমাদের মতো উৎসাহী দের দেখাবে। সূর্যের আলো এবং প্রতিবিম্বত ছায়ার প্রতিক্রিয়া এসব নানা প্রতিক্রিয়া ... যাতে ধরা পড়ে সেজন্য তারা নানা যন্ত্রপাতি নিয়ে একেবারে প্রস্তুত। বিশাল একটি সৌর চশমা প্রস্তুত করা হয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়ে জনা পঁচিশেক লোক একসাথে গ্রহণ দেখতে পারবেন। সেন্টারের অধিকর্তা স্বয়ং মাইক্রোফোন সেট চালু করে সবাইকে এবং উপস্থিত বিজ্ঞান অনুরাগীদের বিভিন্ন উপদেশ দিচ্ছেন। কোন জায়গায় দাঁড়ালে ভালো গ্রহণ দেখা যাবে সেই জায়গায় সকলকে অপেক্ষা করতে বলছেন। তিনি সকলকে আশ্বস্ত করলেন গ্রহণ চলাকালীন ধারাবিবরণী দেবেন সকলে যেন চুপচাপ তাঁর কথা অনুসরণ করেন। তাহলেই সমস্ত ঘটনা সবাই বুঝতে পারবেন।

বুঝলাম আমরা একেবারে যথার্থ জায়গায় উপস্থিত হয়েছি। জীবনে এমন কাঙ্ক্ষিত সুযোগ বড় কম‌ই আসে। ঠিক। মাহেন্দ্রক্ষণ আসার কিছু মুহূর্ত আগেই সায়েন্স সেন্টারের অধিকর্তা মাইক্রোফোন চালু করলেন। ছাত্রছাত্রী এবং ভদ্রমহোদয়গণ .....

শীতের সকালে রোদ ঝলমল করছিল। সাহেব বাঁধে প্রচুর পাখি এসে বসেছিল, কচুরিপানার ভিতরে। আশেপাশের গাছে ছিল অনেক পাখি।মাঠে গরু চড়ছিল। অধিকর্তামশাই আমাদের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। বললেন, আপনারা প্রাণীদের ওপর নজর রাখুন। সামনে একটা সাদা জবা ফুলের গাছ ছ'মাস ধরে বিশেষ করে প্রস্তুত করা হয়েছিল, এই দিনটির জন্য। ঝাঁকড়া ওই গাছে সেদিন সকালের ফোটা ফুলগুলো আমাদের সামনে তুলে রাখা হচ্ছিল, অতটা খেয়াল করিনি। ওনার কথায় দেখলাম। সারা গাছে ফোটা ফুল একটিও রাখা হয়নি। শুধু ছিল গাছভর্তি অসংখ্য কুঁড়ি।

গ্রহণ শুরু হতেই কাক, বক, মেটে বক, মাছরঙা যে পাখিগুলো সাহেব বাঁধে খাবারের সন্ধানে এসেছিল তারা অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। মাঠের গরু হঠাৎ বাড়ি মুখো। খাঁচায় বাঁদর, হনুমান হুফহাফ মুখে আওয়াজ করছে। অজগর নিজেকে বদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করতে চাইছে যেন। পাখি পাখালিরা হঠাৎ উড়তে উড়তে বাঁক ঘুরছে নীড়ের পথে।

রাত্রি নামার কথা নয়, কিন্তু রাত্রি নামছে। আকাশে ঘন কালো মেঘের আস্তারণের অন্ধকার নয়। এ অন্ধকার একেবারে প্রকৃত রাতের অন্ধকারের মতো। অথচ প্রতিটি প্রাণীর শরীরের বায়োলজিক্যাল ঘড়ি নির্দেশ করছে এটা রাতের সময় নয়, এসব অস্বাভাবিক লাগছে ওদের। স্বাভাবিক রাত্রি নামার সময় এটা নয়।

ক্রমে রাতের আকাশ হয়ে ফুটে উঠছে একটা দুটো তারা। নক্ষত্র - নক্ষত্রমণ্ডলী অধিকর্তা অঙ্গুলি নির্দেশ করে চিনিয়ে দিচ্ছেন কোনটি কোন তারা। তারপর তারায় ভরা আকাশের সাথে পরিচয় করালেন, এই আকাশ ঠিক এক‌ই নক্ষত্রদের অবস্থানে কোন তারিখের আকাশ দিনের বেলায় হয়। যদিও তা আমাদের দৃষ্টিগোচরে আসেনা। রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে।

এই সব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সূর্য ক্রমশ ঢাকা পড়ে গেল। সম্পূর্ণ একটা চাকতির (কয়েন) মতো ... এই সময়টাকে বলা হয় সূর্যের 'করোনা' স্থিতি। আজকের লকডাউনের করোনা সংক্রমণের ভোগান্তি নয়। করোনা সংক্রমণের সঙ্গে এর কোনো সংযোগ নেই।

সম্পূর্ণ সূর্য ঢাকার পরে তারপর যেই সামান্য আলোর বিচ্ছুরণ ঘটবে অধিকর্তা আমাদের সতর্ক করলেন, এবার দেখতে পাবেন ডায়মন্ড রিং! প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ডায়মন্ড রিং। আমাদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। কেউ কেউ চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, 'ওঁ জবাকুসুমং ...'! হঠাৎ সঙ্কটতারণবাবু আমাকে চেপে ধরলেন, শিবানন্দ, ব্যাগ থেকে সরবিট্রেটের শিশিটা বের করে দাও! চমকে উঠলাম হার্ট অ্যাটাকের মতোই দৃশ্য বটে!

তাড়াতাড়ি সরবিট্রেটের শিশি বের করে একটা ট্যাবলেট বের করে দিলাম। উনি সেটা জিভের তলায় রেখে বললেন, জন্ম সার্থক হলো আজ বুঝলে! সত্যিই ডায়মন্ড রিং থেকে যে আলোর দ্যুতি ধাবমান হয়ে গেল ... এই মহাজাগতিক সেই দৃশ্য যিনি প্রত্যক্ষ করেননি তাঁকে ভাষায় বোঝানো যাবে না।

একটা কথা স্পষ্ট মনে আছে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বেশিরভাগ মানুষ সেদিন সৌর চশমা ব্যবহার ভুলেছিলেন। এমনকি বিশাল সৌর চশমার ভিতর থেকে যাঁরা গ্রহণ দেখছিলেন, তাঁরাও ছুটে বেরিয়ে এসে খোলা চোখে গ্রহণ দেখেছেন। শুধু যারা হলের ভিতরে টিভির পর্দায় গ্রহণ দেখছিলেন, তারা জানতেই পারেনি মানুষের উন্মাদনা কোন পর্যায়ে উঠেছিল।

উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়েছিল আলো কমার গতির সঙ্গে যা, গ্রহণ শেষ পর্বে সেই গতিতেই ফিরেছিল। পাখিদের দল আবার আহারের সন্ধানে বেরিয়েছিল। গরুরা ফিরছিল মাঠে। কিন্তু তাদের হাবভাব, চোখের নড়াচড়া বুঝিয়ে দিয়েছিল, তারা সমস্ত বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে অনুভব করছে, কেউ স্বাভাবিক নেই। গাছের গোড়ায় সূর্যের প্রতিফলন সাপ চলাচলের ভয় খাইয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। আর সবথেকে চমকে দিয়েছিল ঝাঁকড়া সাদা জবা ফুলের গাছটি।

অধিকর্তা ধারাবিবরণীর মাঝে মাঝে ওই গাছের দিকে সকলকে লক্ষ্য রাখতে বলছিলেন। কুঁড়িগুলোকে দেখছিলাম ক্রমশ যেন পাখা মেলতে চাইছে। মহাজাগতিক ঘটনার সাথে মহাপ্রাকৃতিক কত দৃশ্য ঘটে ... চোখের সামনে ফুলের পাঁপড়ি মেলা! কোনটি ছেড়ে কোনটি দেখবো?

গ্রহণ শেষ পর্বে উপস্থিত সকলে আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, এক গাছ ফোটা ফুলের সাজে আমাদের সামনে গাছটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাততালি দিয়ে অনেকেই নেচে উঠেছিলেন। আমরা দু'জন উত্তেজনায় কখন উঠে দাঁড়িয়েছি জানি না, সম্বিত ফিরতেই ধপ করে সেন্টারের সিঁড়িতে বসে পড়েছিলাম। এবার একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। সঙ্কটতারণবাবুর প্রতি নজর রাখতে হচ্ছিল বিশেষ করে। আমিই তাঁকে নিয়ে এসেছি।

যুদ্ধ জয়ের আনন্দ নিয়ে সেদিনই ভায়া আসানসোল আমরা বর্ধমানে ফিরেছিলাম সন্ধ্যার আগেই।

          ছবি : সংগ্রহ। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় ওই দিনের 
          সূর্যের  'করোনা স্থিতি'।  এ ছবি ভারতে তোলা।