Scrooling

নন্দীগ্রামে বিজেপি সমর্থক খুনে রিপোর্ট চাইলো কমিশন # ১৮ তম লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল জানা যাবে ৪ জুন

ইতিহাসে উপেক্ষিত

ইতিহাসে উপেক্ষিত

 ✳ শিবানন্দ পাল

 ➡ রাসবিহারী বসু সম্পর্কে অনেকের আগ্রহ এই পোস্ট লিখতে উৎসাহিত করেছে। ১৯১৫ সালে যে মানুষ ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই মানুষ তিরিশ বছর ধরে বহির্ভারতে লড়াই চালালেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। একটা সেনাবাহিনী গঠন করে সঁপে দিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে। সেই মানুষ সম্পর্কে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মূল্যায়ন হয়নি বললেই চলে।

আমাদের সৌভাগ্য যে রাসবিহারী বসুর জন্ম হয় এই বর্ধমান জেলায় রায়না থানার সুবলদহ গ্রামে। এখন পূর্ব বর্ধমান জেলায়। আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁর গ্রামের সাথে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো পড়ে আছে মধ্যযুগে। রাসবিহারী বসুর জন্মভিটেতে এখন গরু বাঁধা হয়। নির্মল জেলা অভিযান চলাকালীন সময়ে জেলা পরিষদের সৌজন্যে একটি শৌচাগার তৈরি করা হয় সেই ভিটের এক কোণে।


আনন্দবাজার পত্রিকায় ৩ মার্চ, ২০১৯ রাসবিহারী বসু সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনের সংযোজনে আমার একটি চিঠি প্রকাশিত হয়।  সেই চিঠির প্রেক্ষিতে আমার এই পোস্ট।

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই শ্রীমতী তোশিকোর সঙ্গে রাসবিহারী বসুর বিবাহ সম্পন্ন হয়। ১৯২০-র ১৩ আগস্ট জন্ম নেয় পুত্র মাশাহিদে, যার ভারতীয় নাম রাখা হয়েছিল ভারতচন্দ্র। ১৯২২-র ১৪ ডিসেম্বর জন্ম হয় মেয়ে তেৎশুকো-র। ১৯২৩ সালের ২ জুলাই জাপানের নাগরিকত্ব পান রাসবিহারী বসু।নাগরিকত্ব প্রাপ্তির ঠিক আগে মার্চ মাসে এবং তার পরেই ১৯২৩-র সেপ্টেম্বর মাসে, জাপানে প্রবল ভুমিকম্প হয়।

সমুদ্রের ঢেউ ৪০ ফুট উঁচু সুনামি হয়ে দেখা দিয়েছিল। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ মারা যায়। ৪০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়, ধরে নেওয়া হয় তাঁরা মারা গিয়েছে। এ ছাড়াও ৪৪ হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়। রাসবিহারীর জাপানের আশ্রয়স্থলটি একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। এই বিপর্যয়ে রাসবিহারী বসু স্ত্রী, আড়াই বছরের পুত্র এবং আট মাসের কন্যাকে নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েন। ওই সময় তাঁকে আবার অজ্ঞাতবাসেও থাকতে হচ্ছিল।

এইরকম দুর্দিনে রাসবিহারী বসু বাংলার বিপ্লবী শ্রীশচন্দ্র ঘোষকে ১০০০ টাকা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। অগ্নিযুগের শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবী শ্রীশচন্দ্র রাসবিহারীর মতো চন্দননগরের ডুপ্লে স্কুলে পড়েছেন। তাঁর সঙ্গে রাসবিহারীর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। রাসবিহারীর পিতা বিনোদবিহারী এবং শ্রীশচন্দ্রের কাকা বামাচরণ শৈশবে খেলার সঙ্গী ছিলেন এবং যৌবনে উভয়ে একসঙ্গে সরকারি ছাপাখানায় চাকরি করেছেন। পারালিবিঘাটি গ্রামের নবীনচন্দ্র সিংহের দুই কন্যাকে দু’জনে বিবাহ করেছেন এবং চন্দননগরে পাশাপাশি বাড়ি করে বসবাস করছিলেন। অর্থাৎ রাসবিহারীর মা ভুবনেশ্বরী দেবী ও শ্রীশচন্দ্রের কাকিমা ব্রজেশ্বরী দেবী ছিলেন আপন সহোদরা।

শ্রীশচন্দ্র শৈশবে পিতৃহীন হওয়ায় পিতৃব্য বামাচরণ ঘোষের কাছে চন্দননগরের ফটকগোড়া অঞ্চলে রাসবিহারীদের পাশের বাড়িতে প্রতিপালিত হয়েছিলেন।

শ্রীশচন্দ্র ভেবেছিলেন, দিল্লি-লাহোর-বারানসী ষড়যন্ত্রের নায়ক রাসবিহারীর বিপদের কথা শুনলে ভারতীয়রা নিশ্চয় অর্থসাহায্য করবেন। রাসবিহারীর নামডাক আছে, সুতরাং তাঁর নাম মন্ত্রশক্তির মতো কাজ করবে। তাই ব্যক্তির পিছনে না ছুটে, তিনি রাসবিহারীর পত্রটি সংবাদপত্রে ছাপিয়ে প্রকাশ করে দেন।

কাগজে রাসবিহারীর চিঠি বা ওই সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর দেখা গেল, মনিঅর্ডারে তাঁর অর্থসাহায্য জুটেছে সর্বমোট ১৬ টাকা। শ্রীশচন্দ্র তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য সহ বাংলার তৎকালীন প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

ওদিকে শ্রীশচন্দ্র তাঁর ব্যাক্তিগত ভাবে টাকা চাওয়ার বিষয়টি সংবাদপত্রে প্রকাশ করায় রাসবিহারী বিরক্ত হয়েছিলেন। শ্রীশকে তিনি পত্রে লেখেন, “আমার ভিতরটা কি কেউ দেখছ, দেশের জন্য যে সবটা পেতে বসে আছি সেটা কি কেউ দেখছ, তাঁরা বোধহয় দেখে, আমি বোমা আর রিভলবার, আমি ষড়যন্ত্রের একটা মস্ত খেলোয়াড়। তাঁরা আমায় জানবে কেন? ঘুম না ভাঙলে তাঁরা আমায় জানবে কেন?”

পরে অবশ্য শ্রীশকে সান্ত্বনা দিয়ে লিখেন, “আচ্ছা লড়ে যাব, তোমরা অত ভয় খেয়ো না।“

শ্রীশচন্দ্র জানতে পারেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে জাপান সাহায্য তহবিলের সংগৃহীত অর্থ মোট ৬২১ টাকা রাসবিহারী বসুর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তখনও শ্রীশচন্দ্র ভাবলেন এক হাজার তো হল না! তাই আবার তিনি মদনমোহন মালব্য এবং লালা লাজপত রাইকে চিঠি লিখলেন। বন্ধুদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ওঁরা দুজনেই কিন্তু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন‌‌।

কিন্তু শ্রীশচন্দ্রের চিঠিতে কোনো কাজ হয় না। দিন পেরিয়ে যায়। শেষে রাসবিহারীর চিঠি পেয়ে শ্রীশচন্দ্র তাঁর জন্য অর্থসংগ্রহের কাজ ত্যাগ করলেন।

ব্রিটিশের শত্রু রাসবিহারী বসুর দুর্দিনে ভারতীয়রা কেন অর্থ সাহায্য করেনি! এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করলে বেশ কয়েকটি ব‌ই হয়ে যাবে। দু'একটি কথা উল্লেখ করতে চাই।

জাপানে রাসবিহারীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে আইনত কোনও ব্যবস্থা নিতে পারছিল না। কিন্তু বেআইনিভাবে সেই চেষ্টায় তারা সফল হয়েছিল ভারতে। তাই রাসবিহারীকে অর্থসাহায্য করার সামর্থ্য থাকলেও ভারতের অভ্যন্তরে সে সাহস প্রায় কেউই দেখাতে পারেননি। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের কথাই আলাদা।

আমরা সবাই কমবেশি জানি। রাসবিহারী বসু পি এন ঠাকুর-এর (রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়) ছদ্মবেশে ব্রিটিশের দেওয়া পাসপোর্ট নিয়ে কলকাতা ত্যাগ করেছিলেন।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কী কিছুই জানতেন না?

‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা রাসবিহারী সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে লিখছিল, তিনি বলশেভিক-আফগান কত কী ষড়যন্ত্রই না করে চলেছেন।

ব্রিটিশের শত্রু রাসবিহারী নিশ্চয়। কিন্তু কী কারণে?
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কারণে! তাহলে?

প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, রাসবিহারী বসুর সঙ্গে চন্দননগরের শ্রীশচন্দ্রের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। রাসবিহারী বসু তাঁকে নিয়মিত চিঠিপত্র ও বই পাঠাতেন। নানা আশাভঙ্গের কারণে শ্রীশচন্দ্র দারিদ্র ও মানসিক পীড়নে পরবর্তীকালে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন।
রাসবিহারীর পাঠানো বই বুকে চেপে ধরে তাঁকে প্রকাশ্যে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন চন্দননগরের  বহু মানুষ। ১৯৪১ সালের ২ মে এই মানুষটি আফিম সেবন করে আত্মহনন করেন। সুভাষচন্দ্র বসু তখন কলকাতা ত্যাগ করে জার্মানি পৌঁছে গিয়েছেন।

বি: দ্র: লেখাটি রাসবিহারী বসুর ১৩৪তম জন্মদিন ২৫ শে মে পোস্ট করতে পারলে খুশি হতাম। তাঁর জন্মদিন ২৫ মে, ১৮৮৬ সুবলদহ গ্রামে।