চৈতন্য মহাপ্রভু'র নামে নব নির্মিত তোরণ উদ্বোধন কাটোয়ার দাঁইহাটে

করোনার ফাঁসে জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতি 

অভিজিৎ মিত্র


১ “উদ্যমেন হি সিদ্ধন্তি কার্যানি ন মনোরথৈ / ন হি সুপ্তস্য সিংহস্য প্রবিশন্তি মুখে মৃগা” 

লক-ডাউন আবার বাড়ল। ২১+১৯+১৪=৫৪ দিন। একটা বিরক্তি, একটা হতাশা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। মনে হচ্ছে, সরকার কিংকর্ত্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেছে। অদক্ষতা এবং অবিবেচনার পরিনাম। যাইহোক, গত এক সপ্তা তিনটে বই নিয়ে বুঁদ হয়ে আছি। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, কার্ল মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’ এবং অমর্ত্য সেনের ‘অন এথিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স’। 

শেষ না হলে ছাড়ব না। এই তিনটে বই পড়তে পড়তে বুঝলাম, তাত্ত্বিকভাবে অর্থনীতির যে দুটো উৎস রয়েছে – এথিক্স বা নীতি এবং ইঞ্জিনীয়ারিং বা ব্যবহারিক, সেটা কোথাও কোথাও গিয়ে মিশে যায়। মানুষের জন্য। কারন দিনের শেষে যে কোন বিজ্ঞান সমষ্টিগতভাবে মানুষ ও সমাজের ভালই চায়। 

এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ল। বলে নিই। ৪ঠা মে আগের লেখাতে বলেছিলাম, আমি বোকা মানুষ, মাথায় বুদ্ধি খুব কম। কিন্তু মনে কোন প্রশ্ন থাকলে পেটে চেপে রাখতে পারি না। এই যেমন এখন। কিছুদিন ধরেই দেখছি, কিছু তথাকথিত সবজান্তা বুদ্ধিজীবী মানুষ বারবার টিভি বা খবরের কাগজে বলে চলেছেন, করোনাকে হারাতে হলে লক-ডাউন হল একমাত্র উপায়। অতএব লক-ডাউন বাড়িয়ে চলা উচিৎ। তবেই আমাদের সমাজ থেকে করোনা নাকি ‘এক্সটার্মিনেটেড’ হবে।  এদের মাথায়-মুখে-পেটে-পায়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনারা এত সিওর হয়ে এই কথাগুলো বলছেন কি করে? দিন-রাত এক করে পড়াশোনা শেষে তবে এই কথাগুলো বলছেন তো? ক’জন মহামারী বিশেষজ্ঞের মতামত পড়েছেন? তাহলে ২৫ মার্চ লক-ডাউনের প্রথম দিনে ভারতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৬১৮ থেকে আজ, ১০ মে অব্ধি, সেটা ৬২৯৩৯-এ পৌঁছল কি করে? আমি একটা সহজ নীতি সারাজীবন মেনে এসেছি। যেটা যুক্তিসহ জানিনা বা অস্পষ্ট জানি, সেটা প্রথমেই স্বীকার করে নিই যে জানিনা। কারণ আধা জেনে অনুমানের ভিত্তিতে যদি কোন উপদেশ দিই, সেটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।  

তো, কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ দিয়েই শুরু করি। বুঝতে সুবিধে হবে। অর্থশাস্ত্র মোট ১৫টা বই, ১৫০টা অধ্যায় ও ১৮০টা বিষয় নিয়ে লেখা। অষ্টম বই ‘স্বভাবদোষ ও বিপর্যয় প্রসঙ্গে’। ৫টা অধ্যায়। শ্যামশাস্ত্রীর সুন্দর ইংরাজি অনুবাদে অর্থশাস্ত্রের এই বই একবার পড়তে শুরু করলে মাঝরাস্তায় থামা কঠিন। আমি পাঠকের সুবিধের জন্য আমার মত করে সংক্ষেপে বলছি। দেখুন তো এই সময়ের জন্য এর কটা প্রযোজ্য। 

(ক) কোন এক নির্দিষ্ট বিষয়ের বিপর্যয় যদি সমাজের অন্য সমস্ত বিষয়কে গ্রাস করে নেয়, তাহলে সেটা ভয়ঙ্কর এবং খুব তাড়াতাড়ি তার সমাধান দরকার। 

(খ) অন্ধ রাজা ও বিজ্ঞানবিরোধী রাজার ভেতর অন্ধ রাজা ভাল কারন অন্ধ রাজার সঙ্গীরা তাকে ভাল পরামর্শ দিতেও পারে কিন্তু বিজ্ঞানবিরোধী রাজা অবিবেচকের মত গোটা সমাজ ধ্বংস করে দেন।  

(গ) বিপর্যয়ের সময় অসচেতনতা এবং বিশৃঙ্খলা সাধারন মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে। 

(ঘ) বিপর্যয়ের সময় মদে আসক্তি মানুষের বাহ্যজ্ঞান লোপ করে দেয়। 

(ঙ)বিপর্যয় (মড়ক) এবং অনাহারে দুর্ভিক্ষের ভেতর দুর্ভিক্ষ বেশি ধ্বংসাত্মক কারন মড়ক সমাজের সবাইকে ছোঁয় না কিন্তু দুর্ভিক্ষ হলে তা গোটা সমাজকে ছুঁয়ে যায়। 

(চ) কোন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে উপার্জিত অর্থ কোষাগারে সযত্নে রেখে দেওয়া উচিৎ যাতে তা বিপর্যয়ের সময় ক্ষতিগ্রস্থ সাধারন মানুষের কাজে আসে। 

এই বই পড়ে আমি তো অবাক। স্পেলবাউন্ড। ২২০০ বছর আগে লেখা একটা বই, আজও এত প্রাসঙ্গিক? বিপর্যয় বা মড়ক প্রসঙ্গে এখানে ওপরের পয়েন্টগুলো এত সুন্দর ভাবে লেখা আছে যে মনে হবে, এই বই আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য বাধ্যতামূলক নয় কেন? বিশেষ করে (ঙ) পয়েন্টটা চোখে যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এবার সময় হয়েছে চুপচাপ বসে না থেকে লক-ডাউন তোলার, অন্তত রেড জোন বাদ দিয়ে বাকি জায়গাগুলোয়, না হলে কিন্তু পরে আমাদের সমাজে আরো বড় এক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। 

একই সঙ্গে পড়ছি অমর্ত্য সেনের ‘অন এথিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স’। আসলে অর্থনীতির ঐ সমান্তরাল দুটো উৎস বোঝার চেষ্টা করছি। অমর্ত্য সেনের এই বই পড়তে গিয়ে জানলাম অ্যারিস্টটলের বই ‘দ্য নিকোমেকিয়ান এথিক্স’-এ একটা সুন্দর কথা লেখা আছে – ‘Politics must use the rest of the sciences, including economics’। গোদা বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘রাজনীতিবিদরা নীতি নির্ধারনের সময় যেন সমস্ত বিজ্ঞান ও অর্থনীতি মাথায় রাখেন’। অপূর্ব লাইন, তাই না? এক লাইনে কত কিছু বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজার নীতি। যে রাজার ওপর কোটি কোটি প্রজার জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। রাজা কি একপেশে কোন অবিবেচক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? নেওয়া উচিৎ? 

দেখুন তো, কৌটিল্য আর অ্যারিস্টটলের চিন্তাধারা কি সুন্দর মিলে যাচ্ছে। 


২ “লোভাৎ ক্রোধ প্রভবতি, লোভাৎ কাম প্রজায়তে / লোভান্‌ মোহশ্চ নাশশ্চ, লোভ পাপস্য কারণম্‌” 

কোন দেশের নাগরিকের জীবনের মৌলিক অধিকার। প্রজাদের ভালভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। কে নির্ধারণ করে? কে দেয়? সে দেশের সরকার। মাঈ-বাপ সরকার। দেশের রাজা। সমস্ত সাধারন প্রজার জীবন ও জীবিকা মসৃন করার জন্য রাজা অনেক জনকল্যান মূলক কাজ করেন এবং প্রয়োজনে দুষ্টের বিনাশ করেন। ‘পরিত্রানায় সাধুনাম বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম’। কিন্তু আমাদের দেশে যখনই সাধারন মানুষের জীবন নিয়ে কিছু বলতে যাই, প্রথমেই মাথায় আসে এক শ্রেণীর মানুষের অসাধুতা ও লোভ। একটা বৃহত্তর শ্রেণীকে ঠকিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য ঘুরপথে রোজগার বা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পিছপা নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নামক এক আন্তর্জাতিক সংস্থার ২০১৯ সালের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে দুর্নীতি নামক ঘূণপোকা ভারতের ভেতরে করোনার থেকে বহুগুণ বেশি সংক্রমন ঘটিয়েছে। ভারতে গড়ে ৫১% মানুষ ঘুষ দিয়ে নিজের কাজ উদ্ধার করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতি ৭টা সরকারী অফিসের ভেতর ৫টায় ঘুষ বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাজ করাতে হয়েছে। ভারত দুর্নীতির নিরিখে বিশ্বের ৮০ তম দেশ। শ্রীলঙ্কা আর পাকিস্তানের একটু ওপরে। তো, এই অভ্যেস রয়ে গেছে। যার প্রতিফলন আমরা দেখলাম কোভিড-১৯ এর দুর্দিনেও। প্রথমেই দশ টাকার মাস্ক চল্লিশ টাকায় বিক্রি হতে আরম্ভ হল। সেই শুরু। ওষুধ দোকানে নয়, বিক্রি হতে শুরু করল কালোবাজারে। হাসপাতালে বেড পাবার জন্য ঘুষ দিতে হল। প্রাইভেট নার্সিংহোম করোনা চিকিৎসার নামে চালু করল ছ-সাত লাখ টাকার প্যাকেজ। তারপর রেশন দুর্নীতি। মানুষ খেতে না পেয়ে যখন হাহাকার করছে, তখন তাকে চাল-ডাল-আটার ওজনে ঠকানো হচ্ছে, কোথাও অর্ধেকের কম দেওয়া হচ্ছে, কোথাও বলে দেওয়া হচ্ছে, নেই। সন্তর্পনে সেইসব সামগ্রী সরিয়ে ফেলে বাইরে বেশি দামে বেচে দেওয়া হচ্ছে। অথবা সেগুলো চলে যাচ্ছে পার্টি অফিসে। রাগে যখন সাধারন মানুষ বিদ্রোহ করছে, তখন সেইসব ডিলারদের সাময়িক সাসপেন্ড করা হচ্ছে। কিন্তু দুষ্টের দমন আর জনসাধারনের রক্ষা? সেটা হল কই? ক্ষিদের জ্বালায় গরীব মানুষগুলো নেতার পা ধরছে। তখন দেখা হচ্ছে সে পার্টিকে ভোট দেয় কিনা, সে সেই রাজ্যের ভোটার নাকি অন্য রাজ্যের। একমাত্র ভোটার ত্রান পাচ্ছে, বাকিরা নয়। এটা ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? পরিযায়ী শ্রমিকরা খেতে না পেয়ে কুকুরের সঙ্গে ফুটপাতে ঘুমিয়ে পুলিশের লাঠিপেটা সহ্য করে লক-ডাউনের মাঝেই লুকিয়ে চুরিয়ে ঘুরপথে বাড়ি ফিরতে চাইছে। সেখানেও দালালচক্র, যারা ভেতরের রাস্তা চেনে। তাদের টাকা গুনতে হচ্ছে। পেটে দানা নেই জল নেই, এরা দালালের দেখিয়ে দেওয়া রাস্তায় হাঁটতে শুরু করছে। ২০০-৫০০-১০০০ কিলোমিটার। কেউ পারছে, কেউ পারছে না। তার নিথর দেহ মাঝরাস্তায় সেই বনজঙ্গলের ভেতর পড়ে থাকছে। এমনকি, এই ভয়ঙ্কর আতিমারির মাঝে নিঃস্ব শ্রমিকদের ট্রেনে করে নিজের রাজ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের কাছে ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। যাদের টাকা নেই, তারা হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রেললাইনে শুলে মালগাড়ী কখন যেন এসে তাদের পিষে দিয়ে যাচ্ছে। হে রাজা, এজন্যই কি আমাদের গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান লেখা হয়েছিল? অমর্ত্য সেন কিছুদিন আগে বলেছিলেন, দেশের মানুষ লক-ডাউনের জন্য প্রস্তুত কিনা সে ব্যাপারটা জানা দরকার। জানা হয়েছিল কি? নাকি লক-ডাউন তড়িঘড়ি চাপিয়ে দেওয়া হল? দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী দেশের তিরিশ কোটি জনগনের জন্য এই লক-ডাউনের সময় চিকিৎসা আর খাবারের ব্যবস্থা সুপরিকল্পিত ভাবে না করেই লক-ডাউন শুরু করে দেওয়া হল। সরকার যে গরীবগুর্বো লোকেদের ভোটে ভর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, এই অসময়ে দেখলাম তাদের প্রতি অবজ্ঞা আর অবহেলা তো চলছেই, বরং এক শ্রেণীর প্রভাবশালী লোকেদের বিশেষ কিছু সুবিধে দেবার জন্য সরকারের তোড়জোড় দেখে অবাক লাগল। লক-ডাউনের মাঝেও দেখলাম সরকার বিদেশ থেকে ধনী লোকেদের এদেশে উড়িয়ে আনছে, কোটায় পড়াশোনা করা আমলা-মন্ত্রীদের ছেলে-মেয়েদের ভলভো বাসে নিজের রাজ্যে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, সরকারী স্ট্যাম্প নিয়ে প্রভাবশালী লোকেদের গাড়ি দিব্যি ঘুরছে আর করোনা ছড়াচ্ছে, আধিকারিকরা করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের জন্য চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা হচ্ছে, ভূতপূর্ব কোন মুখ্যমন্ত্রী জাঁকজমক করে তার ছেলের বিয়ে দিচ্ছে, কোন রাজনৈতিক নেতা তার জন্মদিনে মদের পার্টি দিচ্ছে। 

আর কোন গরীব মরলে... টুইটারে এক লাইনের ছোট্ট একটা শোকপ্রকাশ। ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার কি অপরিসীম লোভ! এই কি আমার ভারতবর্ষ? চিকিৎসার অধিকার (ভারতীয় সংবিধানের ২১ নং অংশ), খাদ্যের সুরক্ষা (২০১৩) আর শিক্ষার অধিকার (২০০৯) নামক তিনটে আইনে যে ভারতবর্ষের সমস্ত নাগরিক বা শিশুদের মৌলিক অধিকার রয়েছে - শুধুমাত্র মন্ত্রী, আমলা বা ভিআইপি দের নয় - সেটা কি সরকার আপাতত ভুলে গেছে? 

টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে যখন ৩০০ কিলোমিটার হাঁটতে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে নিথর হয়ে যাওয়া ১২ বছরের বাচ্চা আদিবাসী মেয়েটার লাশ অথবা কুকুরের পাশে আবর্জনায় মরে পড়ে থাকা এক পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ বা পোড়াতে না পেরে হাসপাতালের মধ্যেই একটা ঘরে ডাঁই করে রেখে দেওয়া গরু-ছাগলের মত বেওয়ারিশ লাশ অথবা মহারাষ্ট্রে রেললাইনে শুয়ে থাকা ১৬ জনের ওপর দিয়ে সকালের আলোয় মালগাড়ী চলে যাওয়ার পর তাদের ছিন্নভিন্ন মাংসের টুকরো বা ভাইজ্যাগের গ্যাস লিকের পর রাস্তায় পড়ে থাকা কাতারে কাতারে মানুষ দেখছি, ভাবছি, এদেশে সরকারের কাছে সাধারন মানুষের জীবনের মূল্য কতটুকু? আদৌ আছে? নাকি জীবনানন্দের কবিতার মত এখানে গরীব ভারতবাসীর একটাই পরিচয় -- ‘তাই লাশকাটা ঘরে, চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে’?


৩ “সর্ব আত্যয়িকং কার্যং শৃণুয়ান্নতিপাতয়েৎ / কৃচ্ছসাধ্যং অতিক্রান্তং অসাধ্যম বা অভিজায়তে”  

বিভিন্ন রিপোর্ট দেখছি বলছে কোভিডের জন্য গোটা বিশ্বে নাকি প্রায় অর্ধেক কর্মজীবি মানুষ কাজ হারাতে চলেছেন। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর ৩৩০ কোটি কর্মজীবি মানুষের ভেতর বেকার হবেন প্রায় ১৬০ কোটি। এদের ভেতর অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। সেখানকার ছবি সবথেকে খারাপ। অসংগঠিত ক্ষেত্র কি জিনিষ? যা কোন সংগঠনের আওতায় নেই। ঠিকে শ্রমিক। যেমন রাজমিস্ত্রি, ইঁটভাটা, সোনার গহনা মিস্ত্রি, কামার, কুমোর, ছুতোর, জেলে, তাঁতী, মুচি, মেথর, ছোট দোকানের কর্মচারি ইত্যাদি। এদের জীবনধারন খুব মুশকিল হয়ে যাবে। এবং প্রায় ৪৩ কোটি ছোট ছোট সংস্থার অস্তিত্ব মুছে যাবে। টাকার অভাবে। তবে দুঃস্বপ্নের এখানেই শেষ নয়। কারন ভারতে এর প্রভাব তিনভাবে পড়বে। এক, ভারতে প্রায় ৯০% কর্মী অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ। এদের জীবন অনিশ্চিত হয়ে যাবে। ফলে বিপিএল মানুষের সংখ্যা তিরিশ কোটি থেকে একলাফে সত্তর কোটি হয়ে যাবে। দুই, সংগঠিত ক্ষেত্রেও প্রায় ৩০% মানুষের চাকরি যাবে। যাদের থাকবে, তাদের মাইনে কাটছাঁট হবে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি (হোটেল, খবরের কাগজ, মিডিয়া, এয়ারলাইন্স, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) এই প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। তিন, বিদেশ থেকে কাজ হারানো মানুষেরা এবার একে একে ফিরে আসবেন। জুন মাসে আমেরিকা থেকে ভিসা শেষ হয়ে যাওয়া আড়াই লাখ কর্মজীবি ফিরবেন। তারপর বাকি দেশ থেকেও, একে একে। এরা ফিরে এসে কিছু করতে চাইবেন। ফলে দেশের কর্মীরা আবার এক প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। ভারতে ইতিমধ্যেই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। এর ওপর এবার একে একে এইসব সংখ্যা যোগ হতে থাকবে। আমার মতে, সরকারের এক্ষুনি খুঁজে বের করা উচিৎ সংখ্যাতত্বের হিসেবে কোন্‌ কোন্‌ কর্মক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সবথেকে বেশি ধাক্কা দিয়েছে। সেটা কি ছোট দোকান-রেস্টুরান্টের কর্মচারিদের? উৎপাদন-নির্মাণ-পরিবহন-ভ্রমন ক্ষেত্রে? বাড়ির কাজের লোকেদের? নাকি অন্য কোন ক্ষেত্রে? সেইসব জায়গায় ব্যবস্থা নেওয়া বা লগ্নি ধরে আনা এখন সরকারের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভাবা উচিৎ কৃষি ক্ষেত্রের কথাও কারন আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। এইসব কৃষক ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য ব্যবস্থা করা দরকার সবার আগে।   


৪ “প্রজাসুখে হিতং রাজ্যঃ প্রজানাং তু হিতে হিতম্‌ / নাত্মপ্রিয়ং হিতং রাজ্যঃ প্রজানাং তু প্রিয়ং হিতম্‌” 

গত ২২ এপ্রিল করোনা প্রসঙ্গে সচেতনতা বিষয়ে লিখেছিলাম, এবার সময় হয়েছে ভারতের রেশন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার এবং গোটা ভারতে একটাই যেন রেশন ব্যবস্থা থাকে। আমার যদি বাংলার রেশন কার্ড থাকে, এমন ব্যবস্থা থাকা উচিৎ যাতে আমি মহারাষ্ট্রে গিয়েও সেই কার্ডেই রেশন তুলতে পারি। এটা সব ভারতীয়র জন্য দরকার। সুখের খবর, কয়েকদিন আগে দেখলাম অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দোপাধ্যায় একই কথা বললেন। আর্থিক প্যাকেজ দেওয়া দরকার, সেটাও বললেন। কিন্তু এই আর্থিক প্যাকেজ বিষয়ে আমার মনে হয় সাবধান হয়ে মাঠে নামাই ভাল। পুরো ছবিটা বুঝেশুনে। কেন? সেটাই বলি। আগেই বললাম, এই মুহুর্তে বিপিএল মানুষের সংখ্যা ধরে নেওয়া যাক সত্তর কোটি। পুরুষ, স্ত্রী, শিশু শ্রমিক মিলিয়ে। প্রাথমিকভাবে আমাদের রেশন ব্যবস্থায় সব ভারতবাসীর জন্য রেশন থাকা দরকার এবং এই সত্তর কোটির জন্য বিনামূল্যে আগামি এক বছর প্রতি মাসে পাঁচ কেজি চাল-আটা, এক কেজি ডাল (এখন যেমন চলছে)। কিন্তু সেটাই তো সব নয়। তাদের ন্যূনতম জীবন ধারনের জন্য কিছু টাকাও চাই। ধরা যাক মাথাপিছু মাসিক ১০০০ টাকা। বাজারদর ঠিকঠাক থাকলে এই বিনামূল্যের রেশনে ও মাথাপিছু হাজার টাকায় এইসব পরিবারের চলে যাবে। অর্থাৎ সরকারকে মাসিক ৭০ হাজার কোটি টাকা এদের পেছনে ঢালতে হবে। বছরে ৮ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। অনেকটা এই রকম একটা হিসেব রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন-ও বলেছেন। কিন্তু এটাই কি শেষ? কৃষকদের কি হবে? ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের জিডিপি-র প্রায় ৩০% কৃষির ওপর নির্ভর করে। প্রায় ১৫ কোটি মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এদের কি হবে লক-ডাউন পরবর্ত্তী সময়ে? এদের প্রত্যেকের জন্যও চাই মাসিক ১০০০ টাকা। অর্থাৎ বছরে আরো ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এবং এই সময় অমর্ত্য সেনের ‘অন এথিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স’-এর উপদেশ মাথায় রেখে সেলফ-ইন্টারেস্ট নয়, প্লুরালিটির দিকে নজর দিতে হবে। আগামী এক বছর প্রতি গ্রামের কৃষকদের সমবায় বা যৌথ খামার ভিত্তিক কৃষিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ছোট লগ্নিকারিদের কৃষিতে লগ্নি করার উৎসাহ দিতে হবে। অথবা সরকারকে কৃষকদের থেকে সরাসরি শস্য বা ফসল কিনতে হবে। ন্যায্য দামে বাজারে বেচতে হবে বা সেগুলো রেশন ব্যবস্থায় ব্যবহার করতে হবে। তাহলে এই গরিব শ্রমিক ও কৃষক পরিবারের জনগনের জন্য আগামী এক বছরে সরকারকে ঢালতে হবে মোট প্রায় ১০.২০ লাখ কোটি টাকা। এর ওপর আছে এই ৫৪ দিন লক-ডাউনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্ষতির পরিমান। ছোট একটা হিসেব করি। লক-ডাউনের জন্য প্রতিদিন পশ্চিমবাংলায় ক্ষতি হচ্ছে গড়ে ৭০০ কোটি টাকা। ভারতে মোট ৩৫ টা প্রদেশ আছে। ক্ষতির পরিমান সমান ধরলে সবার ৫৪ দিনের মোট ক্ষতি ১৩.২৩ লাখ কোটি টাকা বা ১৮৯০০ কোটি ডলার। একটু টাইমস অফ ইন্ডিয়া দেখুন, এক দুঁদে অর্থনীতিবিদ লক-ডাউনের মোট ক্ষতির হিসেব দিয়েছেন ১৯০০০ কোটি ডলার। খুব একটা খারাপ হিসেব তাহলে করিনি! কিন্তু সর্বনাশ! এত টাকা আসবে কোত্থেকে? আসবে হুজুর, আসবে। আপনি অন্ধ না সেজে একটু চোখ তুলে চাইলেই আসবে। দেখুন, আমি বরং একটা একটা করে দেখিয়ে দিই।  

(ক) আমাদের দেশে মন্দির মসজিদ চার্চ গুরুদ্বারায় সব মিলিয়ে সোনা পড়ে আছে প্রায় ৪০০০ টন। ৪০ লাখ কেজি। এই সোনাদানা পাথরের মত বহুবছর পড়ে আছে। এই মুহুর্তে সোনার দাম প্রতি কেজি ৫০ লাখ টাকা ধরলে এই বিপুল পরিমান গচ্ছিত সোনার দাম প্রায় ২০ লাখ কোটি টাকা। 

(খ) এদেশে বিলিওনিয়ার (মানে ন্যূনতম ১০০ কোটি টাকা) ক্লাবে নাম লেখান ব্যবসায়ীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। পরপর যদি নামগুলো এভাবে বলি... আম্বানি আদানি হিন্দুজা পালুনজি কোটাক নাদার দামানি গোদরেজ মিত্তাল বিড়লা বাজাজ পুনাওয়ালা... সে এক বিশাল বড় তালিকা। এদের মোট সম্পত্তির মাত্র ১% করে কেটে যদি সরকারি তহবিলে নেওয়া হয়, তাহলে বিশাল বড় এক ফান্ড তৈরি হবে। কি রকম? একটা উদাহরন দিই। মুকেশ আম্বানির মোট সম্পত্তির পরিমান প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। তার ১% মানে ৪০০০ কোটি টাকা। এভাবে যদি প্রথম ১৫০ জনের ১% সম্পত্তির হিসেব করি, তাহলে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। 

(গ) আমাদের জাতীয় পর্যায়ে যত ক্রিকেটার বা ফিল্মস্টার আছেন, প্রত্যেকের পারিশ্রমিক থেকে আগামি দু’বছর ৫০% করে কেটে নেওয়া হোক। এখন তো হিন্দি বা দক্ষিনী সিনেমায় নায়করা সিনেমা পিছু হরদম ১০০ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নেন, নায়িকারা ৪০ কোটি। বিসিসিআই এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটাররা কেউই বছরে ৩ কোটির নিচে নেন না প্লাস প্রতি ম্যাচ খেলার ফি। তার ওপরে আবার অ্যাড থেকে পাওয়া টাকা। এরকম ৫০০ জনের ৫০% টাকার হিসেব করলে দাঁড়াবে ১ লাখ কোটি টাকা। 

তাহলে ওপরের তিন শ্রেণীর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের থেকে ঠিকঠাক ভাবে আদায় করলে পাওয়া যেতে পারে ২৩ লাখ কোটি টাকা। পাঠক বলবেন এটা অন্যায়, জোরজুলুম। জাতীয় বিপর্যয়ের নামে লোকেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে টান মারা যায় না। সেক্ষেত্রে আমার বিনীত উত্তর হবে, একবার কার্ল মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’ বইটা একটু ঘেঁটে দেখুন। ক্যাপিটাল কি ভাবে তৈরি হয়, কাদের শোষন করে তৈরি হয়, সব উত্তর এখানে আছে। যে কোন কারখানায় উদবৃত্ত বা সারপ্লাস সম্পদ তৈরি হয় যখন পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। সেই পণ্য বিক্রির বাজার থাকে। পণ্যের দাম আবার সরাসরি শ্রম-সময়ের সঙ্গে সমানুপাতিক। কে দেয় সেই শ্রম-সময়? শ্রমিক। শিল্পপতিরা শ্রমিকদের বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করেন। তাহলে সময়ের দামে গড়ে উঠল কারখানার উদবৃত্ত সম্পদ। ক্রিকেটার বা ফিল্মস্টারদের এত টাকা পাবার পেছনেও একটু ঘুরিয়ে নিলে সেই একই যুক্তি। এক্ষেত্রে শ্রমিকরাই উপভোক্তা। আর মন্দির মসজিদে, সেখানে মানুষ ভয়ে দেয়, ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায়। তো, ওপরের তিন শ্রেণীর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাদের ঠকিয়ে বা বোকা বানিয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছে, আজ নাহয় তাদের দুঃসময়ে তাদের তৈরি সারপ্লাস আবার তাদের কাছেই ফেরত যাক। সেটাই তো ন্যায্য বিচার। ভুল বললাম কি? তবে আমি এখানেই থামব না। এই চরম সময়ে সরকারকে আরো কয়েকটা পদ্ধতির কথা ভেবে দেখতে বলব। 

(ঘ) শেষ কয়েক বছরে অন্তত ২০ টা কর্পোরেট সংস্থার কাছে ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণ প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা যেগুলো এনপিএ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। বেশ কিছু বড় বড় নাম এর সঙ্গে জড়িয়ে। আম্বানি আদানি বিজয় মালিয়া নিরব মোদি মেহুল চোক্সি ইত্যাদি ইত্যাদি। এবার যদি সরকার একটু উঠেপড়ে লাগে এইসব অনাদায়ী ঋণ বুঝে নেওয়ার জন্য বা এদের ভেতর যারা ভারত ছেড়ে চলে গেছে তাদের সমস্ত সম্পত্তি ক্রোক করার জন্য, তাহলে ভারতের সাধারন মানুষ এই অসময়ে খুব উপকৃত হয়। এদের অনাদায়ী ঋণের ভার তাহলে করদাতা বা পেনশন প্রাপকদের ঘাড়ে এসে চাপে না। পিপিএফ-এর সুদ ১% কমাতে হয় না, ব্যাঙ্ক-পোস্ট অফিসের সুদ এক-দেড় % করে কমিয়ে সুদের টাকায় দিন গুজরান করা বয়স্ক বুড়ো-বুড়িদের গলায় দমবন্ধ ফাঁস লাগাতে হয় না। 

(ঙ) সপ্তম পে কমিশন অনুযায়ী একদম ওপরের দিকের অফিসার বা আমলাদের মাস মাইনে দু-আড়াই-তিন লাখ টাকা। এই বিশাল অঙ্কের টাকা দেবার প্রয়োজন আছে কি? বাজারের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম ও আনুসাঙ্গিক পণ্য-পরিষেবার দাম বেঁধে রেখে কাউকে যদি একলাখ টাকা মাসমাইনে দেওয়া হয়, সেটা এই বাজারেও অনেক বড় অঙ্ক। তার বেশি দেবার দরকার কি? সুতরাং এভাবে পে-কাট করা যেতেই পারেঃ দু’লাখ টাকার বেশি মাইনে যাদের, তাদের পে-কাট হবে ৫০%, দেড় লাখের বেশি হলে ৪০%, এক লাখের বেশি হলে ৩০%, পঁচাত্তর হাজারের বেশি হলে ২০%, পঞ্চাশ হাজারের বেশি হলে ১০%। আমার হিসেবে এভাবে বছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা বাঁচান যেতে পারে। মন্দ কি? সারা ভারতে এই মুহুর্তে যেখানে জিডিপি-র ৮.১৫% খরচ হয় শুধুমাত্র কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের মাইনের পেছনে, সেখানে এই খরচ জিডিপি-র ৭% -এ নামিয়ে আনলে বাকিটা অন্য খাতে রাখা যাবে। 

(চ) এই মুহুর্তে গোটা ভারতে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারী কর্মচারীর মোট সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। লক্ষ্য রাখা উচিৎ যাতে প্রতি পরিবারের মাত্র একজনই সরকারি চাকরির সুযোগ পায়। তাহলে গড়ে অন্তত দশ কোটি ভারতীয় (প্রতি পরিবার পিছু চার জন) ভালভাবে থাকার সুযোগ পাবেন।  

আরো কয়েকটা পদ্ধতির কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু মনে হয় পাঠক-পাঠিকা এবার আমাকে গোঁড়া কম্যুনিস্ট লেখক হিসেবে মার্কা করে মুন্ডপাত করতে শুরু করবেন। তাই ইচ্ছে থাকলেও এখানেই ইতি। আমাদের দেশে অনেক বড় বড় নীতি নির্ধারকরা আছেন। তারাই ঠিক করবেন এই অসময়ে কি করা উচিত আর কি নয়। আমি শুধু রামকৃষ্ণদেবের আদর্শ অনুসরন করে আমার মত অনুযায়ী কয়েকটা পথ দেখালাম মাত্র। 

তবে হ্যাঁ, এই অংশ শেষ করার আগে একবার ‘উলঙ্গ রাজা’র সেই বাচ্চা ছেলেটা হতে ইচ্ছে করছে। সরকার, মাঈ-বাপ, গুস্তাকি মাফ। এই অংশের শুরুতেই কৌটিল্যের একটা উক্তি তুলে ধরেছি। তাতে খুব সুন্দর ভাবে বলা আছে ‘নাত্মপ্রিয়ং হিতং রাজ্যঃ’। রাজা, আত্মপ্রিয় হবেন না। এই কোভিড-১৯ আর লক-ডাউনের ভেঙে পড়া বাজারে শুধুমাত্র আত্মতুষ্টি বজায় রাখার জন্য ৯২০ কোটি টাকা খরচ করে একটা নতুন পার্লামেন্ট বিল্ডিং বানানো বা সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতির জন্য দুটো প্লেন কেনা কি যুক্তিযুক্ত? 


৫ “সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়া / সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্তু মা কশ্চিৎ দুঃখভাগ ভবেৎ” 

করোনা পরবর্ত্তী জীবন কেমন হবে আমাদের? এই প্রশ্ন আজকাল অনেকেই করছেন। আমার উত্তর – আপাতত কোভিড-১৯এর আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখছি না। আগামি দেড়-দু’বছর তো নয়ই। যে কোন মহামারীর ভাইরাসের ইতিহাস ঘাঁটলে এটাই চোখে পড়ে। এটুকুই বলতে পারি, লক-ডাউন শেষ হলে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। নিজের ও পরিবারের সবার খেয়াল রাখতে হবে। সমাজের প্রতি উদার, সাহসী ও বিবেকবান হতে হবে। আমাদের আশেপাশে অনেকেই হয়ত এখন দুর্দশায় থাকবেন। তাদের সাহায্য করা দরকার। আর সাধারন জনগনকে সুযোগ মত সচেতন করে তুলতে হবে। একজন তুচ্ছ শিক্ষক হিসেবে এটাই চাই, সবাই ভাল থাকুক – ‘সর্বে সন্তু নিরাময়া’। এবং এরপর প্রত্যেকে যেন ‘আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি’ এই মন্ত্রে নিজেকে উজাড় করে দেয়। তাহলে করোনা আমাদের সমাজে ও মনে যে বিশাল বড় এক অবিশ্বাসী গর্ত খুঁড়েছে, তা আবার কালের নিয়মেই বুজে যাবে।  


৬ “মাতা শত্রু পিতা বৈরি য়েন বালো ন পাঠিৎ / ন শোভতে সভামধ্যে হংসমধ্যে বকো যথা”

সবশেষে, মাঈ-বাপ সরকারের কাছে সেই একই বিনীত অনুরোধ। ‘কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/কভু আশীবিষে, দংশেনি যারে?’ নিজেকে হিরো হিরালাল না ভেবে দৃষ্টিভঙ্গি একটু পৃথিবীমুখি করুন। দেখুন, কোন্‌ কোন্‌ দেশ এর আগে এইরকম মহামারীর যন্ত্রনার ভেতর দিয়ে গেছে। দেখুন, এবার কোন্‌ কোন্‌
দেশ তৎপর হয়ে কোভিড-১৯ কে রুখে দিল। কোন্‌ দেশ কোভিডের মার খেয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এদের থেকে পরামর্শ নিন। পৃথিবীব্যাপি এই দুর্দিনে ভারত তাদের দরজায় দাঁড়ালে তারা ফেরাবে না। ঠিক উপদেশ দেবে এবং সরকারের ভুল ধরিয়ে দেবে। একটা ন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কমিটি করুন যেখানে কেরল, সিকিম ও গোয়ার মুখ্যমন্ত্রীদের অবশ্যই রাখুন। এরাই এবার কোভিড-১৯ রুখতে সবথেকে সফল। নিজের সমালোচকদের কথায় কোন সারবত্তা আছে কিনা দেখুন। ছুঁড়ে ফেলে না দিয়ে সেটা গ্রহণ করুন – ‘আত্মবাচ্যম্‌ ন জানাতি জানন্নপি বিমুহ্যতি’। এবং এবার সাদা কাগজে ছক কষতে শুরু করুন, কি ভাবে এই ১৩৮ কোটি জনগনের ৯০% কে সঠিকভাবে শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা যায়। আর ভোটব্যাঙ্ক নয়, ধর্ম-ঈশ্বর নয়, এবার অন্তত অভিভাবকের মত এই দেশকে সঠিক অর্থে একবিংশ শতকের দেশ বানিয়ে তুলুন। আমার এই লেখার প্রথম অংশে কৌটিল্যের বলা (গ)-(ঘ) পয়েন্ট দুটো দেখুন। শিক্ষা ও সচেতনতা না থাকলে কিন্তু জনগন আবার ধ্বংসের মুখে চলে যেতে পারে। রাজা হিসেবে, বাপ-মা হিসেবে, তখন সেই দায় আপনার ওপরেই বর্তাবে। 
(লেখক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যক্ষ)